নয়াদিল্লি: ‘মক পার্লামেন্ট’ নয়, এ বার ‘জনমহাভিযোগ’। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচির পরিকল্পনায় বদল আনল বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। সংসদের কার্যপ্রণালীর অনুকরণে অধিবেশন আয়োজন করলে সংসদের অবমাননার অভিযোগ উঠতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই কর্মসূচির নাম ও ধরন বদলানো হয়েছে বলে কংগ্রেস সূত্রে খবর। শুক্রবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে সরব হবেন বিরোধী নেতারা।
বৃহস্পতিবার এই কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসেছিলেন ইন্ডিয়া জোটের নেতারা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, জয়ারাম রমেশ, নাসির হুসেন, মানিকম টেগর ও পবন খেড়া। তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মহুয়া মাঝি এবং সমাজবাদী পার্টির হরেন্দ্র মালিক-সহ একাধিক দলের প্রতিনিধিও বৈঠকে যোগ দেন।
প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, সংসদের আদলে সরকার ও বিরোধী পক্ষ মুখোমুখি বসবে এবং একজন অধ্যক্ষের পরিচালনায় বিতর্ক হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনমহাভিযোগ’। বিরোধীদের বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ ও আপত্তি জনসমক্ষে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
দায়িত্বে প্রাক্তন লোকসভার স্পিকার মীরা কুমার
শুক্রবার বিকেল ৩টে থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলার কথা এই কর্মসূচির। গোটা পর্ব পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন লোকসভার স্পিকার মীরা কুমারকে। তাঁকে সাহায্য করবেন সমাজবাদী পার্টির এক সাংসদ। তবে তাঁর নাম এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গিয়েছে।
রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে কর্মসূচির সূচনা করবেন। শেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। মোট ১৯টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য রাখার কথা। প্রত্যেকের জন্য পাঁচ মিনিট করে সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে সমাজবাদী পার্টি ও তৃণমূল কংগ্রেসকে ১০ মিনিট করে সময় দেওয়া হবে।
শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের কয়েক জনকেও বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হবে। নাগরিক সমাজের তিন প্রতিনিধিও বক্তাদের তালিকায় থাকবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন বক্তা অংশ নিতে পারেন বলে জানা গিয়েছে। কর্মসূচিটি ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের ইউটিউব চ্যানেল ও সমাজমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হবে।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, মূল নিশানায় নির্বাচন কমিশন
এই কর্মসূচির প্রধান আলোচ্য ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সহ ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলি।
কংগ্রেসের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৬.৫ কোটি নাম বাদ পড়েছে। অন্য দিকে, আলোচ্য সংশোধন প্রক্রিয়ায় ১৩.৫ কোটি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার হিসাবও উঠে এসেছে। এই দুই সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; বিরোধীদের বক্তব্য, সংশোধনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাদ পড়া নামের মোট সংখ্যা আরও বেড়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ফলে বহু মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আপত্তি জানানোর সুযোগ এবং বাদ পড়া নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা। ‘জনমহাভিযোগ’ কর্মসূচিতে সেই অভিযোগগুলিই তুলে ধরতে চান বিরোধী নেতারা।
তবে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে বেআইনি ভাবে নাম বাদ দেওয়ার প্রমাণ এক বিষয় নয়। কোন এলাকায় কত নাম বাদ গিয়েছে, তার কারণ কী এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারদের আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ কতটা কার্যকর হয়েছে—তা নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন।
সংসদের অবমাননার বিতর্ক এড়াতেই বদল?
প্রাথমিক ভাবে ‘মক পার্লামেন্ট’ আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও এখন আর সংসদের অধিবেশনের হুবহু অনুকরণ করা হবে না বলে বিরোধী শিবিরের তরফে জানানো হয়েছে। কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, সংসদের অবমাননা হয়েছে—এমন অভিযোগের সুযোগ তৈরি করতে চান না তাঁরা। তাই কর্মসূচিকে প্রতীকী রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং জনসমক্ষে অভিযোগ পেশের পরিসর হিসেবে সাজানো হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক নাম বদলালেও মূল রাজনৈতিক বার্তা বদলাচ্ছে না। বিরোধীদের লক্ষ্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে জাতীয় স্তরে বিতর্ক আরও জোরদার করা।
ইন্ডিয়া জোটের নেতারা মনে করছেন, সংসদীয় পদ্ধতির প্রতীকী অনুকরণের বদলে ভোটারদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ সামনে আনলে তাঁদের বক্তব্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে। সেই কারণেই বাদ পড়া ভোটারদের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
‘ভোট চুরি’র অভিযোগে আন্দোলন আরও জোরদার করার পরিকল্পনা
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রতিবাদ এই কর্মসূচিতেই শেষ হচ্ছে না। আগামী ১ নভেম্বর বৃহত্তর জনসভা ও প্রতিবাদ কর্মসূচিরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং ভোটাধিকার নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
বিরোধীদের এই উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশনের কাজ ও সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য, নিয়ম এবং অভিযোগের নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা জরুরি।
শুক্রবারের ‘জনমহাভিযোগ’ তাই এক দিকে বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন মঞ্চ, অন্য দিকে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলতে থাকা বিতর্ককে জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্যোগ। কর্মসূচিতে কী কী অভিযোগ সামনে আসে এবং তার পরে নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া জানায়, এখন নজর সেদিকেই।




