মুম্বই: জেলের দরজা বন্ধ। চারদিকে কড়া নিরাপত্তা। বন্দি রয়েছেন দেশের অন্যতম কুখ্যাত গ্যাংস্টার। অথচ অভিযোগ, জেলের ভিতরে বসেই বাইরে অপরাধের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। কখনও খুনের নির্দেশ, কখনও তোলাবাজির ছক, কখনও আবার প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর পরিকল্পনা—সবই চলছে চার দেওয়ালের আড়াল থেকে। অপরাধীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠালেই কি অপরাধের নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা যায়? অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলিচালনার ঘটনা ফের সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে। আলোচনার কেন্দ্রে কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং তাঁর অপরাধচক্র।
মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মোটরবাইকে আসা দুষ্কৃতীরা গুলি চালায় বলে অভিযোগ। অভিনেতা অক্ষত থাকলেও তাঁর গাড়ির চালক আহত হন। ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিয়ো বার্তায় এক ব্যক্তি নিজেকে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্য বলে দাবি করে হামলার দায় স্বীকার করে। বলিউডের আরও কয়েকজনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যদিও এই হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের প্রকৃত যোগ এবং অডিয়ো বার্তার সত্যতা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
বর্তমানে লরেন্স বিষ্ণোই বন্দি গুজরাতের সাবরমতী কেন্দ্রীয় জেলে। তাঁর ভাই অনমোল বিষ্ণোই রয়েছেন দিল্লির তিহাড় জেলে। কিন্তু দু’জনেই জেলের ভিতরে থাকলেও তাঁদের গ্যাংয়ের নাম একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনায় উঠে আসছে। ফলে তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন, জেলের ভিতরে থেকেও কী ভাবে বাইরের অপরাধজগতের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছেন তাঁরা?
জেলের ভিতর থেকেই কী ভাবে চলে অপরাধের সাম্রাজ্য?
তদন্তকারী সংস্থাগুলির মতে, এই অপরাধচক্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার নিষিদ্ধ মোবাইল ফোন। জেলের ভিতরে বন্দিদের হাতে ফোন পৌঁছে গেলে বাইরে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়। ফোনের মাধ্যমেই দেওয়া হয় তোলাবাজির নির্দেশ, ঠিক হয় খুনের পরিকল্পনা, এমনকি নতুন শুটার নিয়োগের কাজও চলে।
এই ব্যবস্থার পিছনে জেলের ভিতরের দুর্নীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ। টাকা বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে জেলের কিছু অসাধু কর্মী বন্দিদের কাছে নিষিদ্ধ মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেন বলে বিভিন্ন তদন্তে অভিযোগ উঠেছে।
তবে শুধু মোবাইল ফোনই নয়, অপরাধের নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার আরও কয়েকটি পথ রয়েছে। আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জেলে দেখা করতে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে বার্তা আদানপ্রদান কিংবা জামিনে মুক্তি পাওয়া সহযোগীদের ব্যবহার করেও বাইরে থাকা গ্যাং সদস্যদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ফলে শারীরিক ভাবে বন্দি থাকলেও অপরাধের নেটওয়ার্কের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হয়।
নব্বইয়ের দশক থেকেই একই কৌশল
জেলের ভিতরে বসে অপরাধের সাম্রাজ্য পরিচালনার ঘটনা নতুন নয়। মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে এর একাধিক নজির রয়েছে। দাউদ ইব্রাহিম, ছোট রাজন এবং আবু সালেমের মতো অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিদেশে বসে অপরাধচক্র পরিচালনার অভিযোগ ছিল। অন্য দিকে, অরুণ গাওলি এবং অশ্বিন নায়েকের মতো গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে জেলে বন্দি থেকেও অপরাধের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
মুম্বই, পুণে, থানে এবং নাসিকের বিভিন্ন জেলে বন্দি থেকেও গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, নতুন শুটার নিয়োগ এবং প্রতিপক্ষকে খুনের পরিকল্পনা করার অভিযোগ উঠেছে। অশ্বিন নায়েকের বিরুদ্ধে জেলে বসে নিজের স্ত্রী নীতা নায়েককে খুনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। স্ত্রী এক পুলিশকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন বলে সন্দেহ করেছিলেন তিনি, এমনটাই ছিল অভিযোগ। যদিও আদালতে সেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ওই মামলায় বেকসুর খালাস পান নায়েক।
একই ভাবে, জেলে বন্দি অবস্থায় জয়ন্ত যাদবকে খুনের পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছিল অরুণ গাওলির বিরুদ্ধে। জয়ন্ত যাদব শিবসেনা প্রধান বাল ঠাকরের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। একটি জেল থেকে অন্য জেলে গাওলিকে স্থানান্তরের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ। সেই আক্রোশ থেকেই তাঁকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তে দাবি ওঠে।
সাবরমতী জেল থেকে সাক্ষাৎকার, ভিডিয়ো কল!
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ক্ষেত্রে জেলের ভিতরে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে একটি হিন্দি সংবাদমাধ্যমে তাঁর দু’টি সাক্ষাৎকার প্রকাশ্যে আসে। প্রথমটি পঞ্জাব পুলিশের হেফাজতে থাকার সময় এবং দ্বিতীয়টি জয়পুর কেন্দ্রীয় জেলে বন্দি থাকাকালীন দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে সাবরমতী জেল থেকে পাকিস্তানের গ্যাংস্টার শেহজাদ ভাট্টিকে ভিডিয়ো কলে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়। ওই বছরই হাশিম বাবা নামে এক বন্দি পুলিশকে জানিয়েছিলেন, লরেন্সের কাছে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল। সেই ফোনের মাধ্যমেই তিনি বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে অভিযোগ।
মহারাষ্ট্রের জেল আধিকারিক স্বাতী সাঠে অতীতে বিভিন্ন জেলে তল্লাশি চালিয়ে বন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছিলেন। তাঁর অভিযানে জেলের ভিতরে নিষিদ্ধ ফোনের ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর সামনে আসে।
গ্যাংস্টারদের কি গোয়েন্দা সংস্থার ‘সম্পদ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়?
জেলের ভিতরে বন্দিদের বিশেষ সুবিধা পাওয়া নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ, কখনও কখনও অপরাধজগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি নিজেদের ‘অ্যাসেট’ বা সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অপরাধজগতের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগকে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী কিংবা সন্দেহভাজনদের গতিবিধি জানার কাজে লাগানো হয় বলে অভিযোগ। বিনিময়ে জেলের ভিতরে নিরাপত্তা কিংবা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও সামনে এসেছে। যদিও এই ধরনের অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়।
বিষ্ণোইদের জেরা করতে গিয়ে আইনি বাধা
টাইগার শ্রফের উপর হামলার তদন্তে লরেন্স ও অনমোলের ভূমিকা জানতে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু দুই ভাইকে জেলের বাইরে নিয়ে গিয়ে নিজেদের হেফাজতে পাওয়ার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থাগুলির সামনে রয়েছে আইনি বাধা।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে লরেন্সকে সাবরমতী জেল থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২৩ সালের অগস্টে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৮ নম্বর ধারায় এই নির্দেশ জারি হয়েছিল। পরে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ৩০৩ নম্বর ধারার অধীনেও একই ধরনের ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়। অনমোলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নির্দেশ রয়েছে বলে জানা যায়।
এর ফলে অন্য তদন্তকারী সংস্থাগুলি সহজে তাঁদের জেলের বাইরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে না। আদালতের অনুমতি নিয়ে জেলের ভিতরে জেরা করা সম্ভব হলেও একাধিক অভিযুক্তকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চালানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।
বাবা সিদ্দিকি খুনের মামলাতেও অনমোলের হেফাজত পাওয়া নিয়ে মুম্বই পুলিশের সামনে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, টাইগার শ্রফের উপর হামলার ঘটনা ফের দেশের জেল ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অপরাধীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানোর পরেও যদি তাঁর নির্দেশে বাইরে গুলি চলে, তোলাবাজি হয়, খুনের পরিকল্পনা হয়, তা হলে সেই বন্দিদশার কার্যকারিতা কোথায়? অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি জেলের ভিতরের দুর্নীতি বন্ধ করা, নিষিদ্ধ মোবাইল ফোনের ব্যবহার রোখা এবং বন্দিদের বাইরের যোগাযোগের উপর কঠোর নজরদারি চালানোই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




