নয়াদিল্লি: ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল জাপানের বিখ্যাত শিনকানসেন প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে একটি সম্পূর্ণ উচ্চগতির রেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পর একের পর এক বাধা, সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া, খরচ বৃদ্ধি এবং ভারত-জাপানের মধ্যে প্রযুক্তি ও ক্রয়নীতি নিয়ে মতপার্থক্য প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকেই বদলে দিয়েছে। এখন মুম্বই-আমদাবাদ উচ্চগতির রেল করিডরে জাপানি নির্মাণপ্রযুক্তির পাশাপাশি ইউরোপীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ভারতে তৈরি বুলেট ট্রেন ব্যবহারের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হয়েছিল ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। এখন প্রথম পর্যায়ের পরিষেবা ২০২৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ চালু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগতে পারে।
১.০৮ লক্ষ কোটি থেকে প্রায় ২ লক্ষ কোটি
বুলেট ট্রেন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১.০৮ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু নির্মাণে বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণের সমস্যা এবং অন্যান্য কারণে খরচ বেড়ে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কোভিড অতিমারির কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়েছিল। তার পাশাপাশি মহারাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের পর জমি অধিগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় জমির অধিকার পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও জটিলতা তৈরি হয়।
ফলে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এই ধরনের বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, অনুমোদন, প্রযুক্তি নির্বাচন এবং নির্মাণের সময়সূচি আগে থেকেই সুস্পষ্ট হওয়া জরুরি। কিন্তু বুলেট ট্রেন প্রকল্পে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব কাজ শুরু হওয়ার পর নানা জটিলতা সামনে এসেছে। তার প্রভাব পড়েছে সময় এবং খরচ—দু’ক্ষেত্রেই।
জাপান ভেবেছিল, পুরো ব্যবস্থাই কিনবে ভারত
ভারত-জাপান সহযোগিতার অন্যতম প্রতীক হিসেবে সামনে এসেছিল বুলেট ট্রেন প্রকল্প। জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম উন্নত উচ্চগতির রেল ব্যবস্থা। প্রাথমিক পরিকল্পনায় রেললাইন, ট্রেন, সিগন্যালিং এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি—প্রায় পুরো ব্যবস্থাই জাপানের কাছ থেকে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত চেয়েছিল, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা বজায় রাখতে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য রুটেও উচ্চগতির রেল চালানোর উপযোগী প্রযুক্তি গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ফারাক থেকেই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। জাপান একটি সম্পূর্ণ সমন্বিত ব্যবস্থা রপ্তানির পক্ষে থাকলেও ভারত বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি বিবেচনা করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক শিল্পক্ষেত্রের সূত্রের বক্তব্য, দুই দেশেরই একে অপরের কাজের ধরন, বাণিজ্যিক পরিবেশ এবং প্রত্যাশা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বোঝাপড়ার অভাব ছিল। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে সময়সীমা ও খরচ নির্ধারণের সময় সব ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি।
জাপানি ট্রেন নয়, আপাতত ভারতে তৈরি B28
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির একটি হল ট্রেনের প্রযুক্তি নির্বাচন। প্রাথমিক ভাবে ভারতে জাপানের E5 সিরিজের শিনকানসেন ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ওই ট্রেনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন E10 ট্রেনসেট সরবরাহে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে ভারত নিজস্ব উচ্চগতির ট্রেন তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা BEML বেঙ্গালুরুতে B28 নামে উচ্চগতির ট্রেন তৈরি করছে। এই ট্রেনের নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার। তবে বাণিজ্যিক পরিষেবায় এর সর্বোচ্চ পরিচালনগত গতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্য দিকে, জাপানের E10 ট্রেনসেট কয়েক বছরের আগে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে প্রথম পর্যায়ে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জাপানি E10 ট্রেন সরবরাহের বিষয়েও আলোচনা চলতে পারে। এই পরিবর্তনের অর্থ, ভারতের বুলেট ট্রেন প্রকল্প আর পুরোপুরি জাপানি ট্রেন প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল থাকছে না। বরং দেশীয় উৎপাদনকে সামনে রেখে উচ্চগতির রেল প্রযুক্তিতে নিজস্ব দক্ষতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
সিগন্যালিংয়ে ইউরোপীয় প্রযুক্তি, চুক্তি প্রায় ৪১০০ কোটি টাকার
ট্রেন কোন সময়ে চলবে, কী ভাবে গতি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং অন্য ট্রেনের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে—এই সব ক্ষেত্রেই সিগন্যালিং ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুলেট ট্রেনের মতো উচ্চগতির রেল ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব আরও বেশি।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় জাপানি সিগন্যালিং প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা থাকলেও এখন ইউরোপীয়-ভারতীয় যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে প্রকল্প। ডিনেশচন্দ্র আর আগরওয়াল ইনফ্রাকন, সিমেন্স ইন্ডিয়া এবং সিমেন্স মোবিলিটি জিএমবিএইচ-কে নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম এই কাজের বরাত পেয়েছে।
চুক্তির মোট মূল্য প্রায় ৪১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিমেন্স ইন্ডিয়ার অংশ প্রায় ১২৩০ কোটি টাকা। সিগন্যালিং ও টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির নকশা, স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার উপর। এই ব্যবস্থায় ইউরোপীয় ট্রেন কন্ট্রোল সিস্টেমের দ্বিতীয় স্তর বা ETCS Level 2 প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা রয়েছে। তবে জাপানি নির্মাণপ্রযুক্তি, ইউরোপীয় সিগন্যালিং এবং ভারতীয় ট্রেন—এই তিনটি ব্যবস্থাকে একই করিডরে নিরাপদে একসঙ্গে চালানোই এখন বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
একই লাইনে ভিন্ন প্রযুক্তির ট্রেন, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
জাপানের উচ্চগতির রেল বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, শিনকানসেন ব্যবস্থার সাফল্যের অন্যতম কারণ হল ট্রেন, রেললাইন, সিগন্যালিং এবং পরিচালনব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত কাঠামোর মধ্যে তৈরি করা। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি অংশ অন্য অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে। আন্তর্জাতিক উচ্চগতির রেল সংস্থার চেয়ারম্যান মাসাফুমি শিকুরি এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন, ভারতীয় B28 এবং জাপানি E10—দুই ধরনের ট্রেন ও তাদের পৃথক সিগন্যালিং ব্যবস্থা একই করিডরে চালাতে হলে নিরাপত্তা ও পরিচালনগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে এগোনোর প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, শুধু ট্রেন তৈরি করে বা সিগন্যালিং সরঞ্জাম বসিয়ে কাজ শেষ হবে না। ট্রেন চালক, প্রযুক্তিবিদ, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী এবং নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাত্রী পরিষেবা শুরুর আগে দীর্ঘ পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইও অত্যন্ত জরুরি। ভারতীয় রেল কর্তাদের বক্তব্য, প্রকল্পের নকশা, নির্মাণ পরিকল্পনা এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পর্যায়ে জাপানি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। ফলে দেশীয় ট্রেন ও বিকল্প সিগন্যালিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে।
জাপানের ঋণ থাকছে, বদলাচ্ছে প্রযুক্তি নির্বাচনের কৌশল
প্রযুক্তি নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হলেও প্রকল্পের অর্থায়নে জাপানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বা JICA-র মাধ্যমে এই প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, অত্যন্ত কম সুদের ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই অর্থায়ন কাঠামো বজায় রেখেই ভারত প্রকল্পের প্রযুক্তিগত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনছে।
প্রকল্পটির জন্য জাপানের দেওয়া ঋণ দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রাথমিক ঋণচুক্তিতে সুদের হারও অত্যন্ত কম। ফলে ভারত এক দিকে জাপানি অর্থায়নের সুবিধা ধরে রাখতে চাইছে, অন্য দিকে প্রযুক্তি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নির্মাণের বাকি কাজ, ট্রেনের পরীক্ষা, সিগন্যালিং ব্যবস্থার সামঞ্জস্য এবং নিরাপদ বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর উপর।
প্রথমে গুজরাত, পরে মুম্বই পর্যন্ত পরিষেবা
মুম্বই থেকে আমদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরে ১২টি স্টেশন পরিকল্পিত। এর মধ্যে রয়েছে মুম্বই, থানে, বিরার, বোইসর, ভাপি, বিলিমোরা, সুরাত, ভরুচ, ভদোদরা, আনন্দ, আমদাবাদ এবং সবরমতী। পুরো রুট একসঙ্গে চালু করার বদলে পর্যায়ক্রমে পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে গুজরাতের সুরাত ও ভাপির মধ্যবর্তী অংশে ট্রেন চালানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তার পর ধাপে ধাপে অন্য অংশগুলি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
মুম্বই পর্যন্ত সম্পূর্ণ পরিষেবা চালু হতে আরও সময় লাগতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুম্বই, গুজরাতের শিল্পাঞ্চল এবং আমদাবাদের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমানো, আঞ্চলিক অর্থনীতিকে যুক্ত করা এবং উচ্চগতির রেল প্রযুক্তিতে ভারতের নিজস্ব দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বুলেট ট্রেন প্রকল্পের শিক্ষা কী?
মুম্বই-আমদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বড় পরিকাঠামো তৈরি করতে শুধু অর্থায়ন ও উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই হয় না। প্রকল্পের শুরুতেই প্রযুক্তিগত চাহিদা, সরবরাহের সময়সীমা, জমি অধিগ্রহণ, অনুমোদন, ব্যয় এবং দুই দেশের কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট সমঝোতা জরুরি। ভারত এখন দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন পথে এগোচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি মিলিয়ে তৈরি ব্যবস্থাটি যেন নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং পরিষেবার মানের ক্ষেত্রে কোনও আপস না করে।
২০২৭ সালের শেষ দিকে প্রথম পর্যায়ের পরিষেবা চালুর লক্ষ্য পূরণ হলে প্রকল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছুঁতে পারে। তবে সময়সীমা, খরচ এবং প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্যের চ্যালেঞ্জ এখনও রয়েছে। ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ধারণ করবে শুধু ট্রেনের গতি নয়—বরং পুরো ব্যবস্থার নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনাও।




