ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছিল—কোনও বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলে মুখ খোলা যাবে না। তাই অফিসে বসেও অনেক সময় নিজের ভাবনা চেপে রাখতেন। আমেরিকায় গিয়ে দেখলেন, সহকর্মীরা ঠিক উল্টো পথে হাঁটেন। সব উত্তর জানা নেই? তবু প্রশ্ন করছেন। কোনও ধারণা মাথায় এসেছে? সঙ্গে সঙ্গে বলছেন। ভুল হতে পারে? তাতেও আপত্তি নেই। প্রথমে মনে হয়েছিল, তাঁরা হয়তো তাঁর চেয়ে বেশি জানেন। পরে বুঝলেন, আসল পার্থক্য জ্ঞানে নয়—নিজের কথা বলার সাহসে। ভারতীয় তরুণী হরিনীর সেই উপলব্ধিই এখন সমাজমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্র।
আমেরিকায় কর্মরত হরিনী জানিয়েছেন, ভারতে বড় হওয়ার সময় তাঁকে বার বার শেখানো হয়েছিল—কথা বলার আগে ভাল করে ভাবতে হবে। কোনও বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলে মতামত না দেওয়াই ভাল। ভুল উত্তর দিলে অস্বস্তি হতে পারে, সমালোচনা হতে পারে—তাই আগে সবটা জেনে নেওয়া, তার পর কথা বলা।
পড়াশোনার জগতে এই অভ্যাস নিঃসন্দেহে কাজে লাগে। পরীক্ষায় তো উত্তর ঠিক বা ভুল—মাঝামাঝি জায়গা নেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা যে একেবারেই আলাদা, আমেরিকায় গিয়ে ধীরে ধীরে সেটা বুঝতে শুরু করেন হরিনী। তাঁর কথায়, যে মানসিকতা তাঁকে ছাত্রজীবনে এগিয়ে দিয়েছিল, কর্মজীবনে এসে সেটিই যেন তাঁকে আটকে দিচ্ছিল।
হরিনী জানিয়েছেন, তাঁর অফিসে তিনিই একমাত্র ভারতীয়। প্রথম দিকে আমেরিকান সহকর্মীদের আচরণ তাঁর কাছে বেশ অদ্ভুত লাগত।
কোনও মিটিংয়ে কোনও বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি ভাবছেন, আগে পুরো বিষয়টা বুঝে নিই। অন্য দিকে তাঁর সহকর্মী হয়তো মাঝপথেই নিজের মতামত জানিয়ে দিচ্ছেন। কোনও প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর জানা নেই? তাতেও থেমে যাচ্ছেন না। নিজের ধারণা বলছেন, প্রশ্ন করছেন, অন্যের বক্তব্য শুনছেন এবং সেই আলোচনার মধ্যেই উত্তর খুঁজছেন। প্রথম দিকে হরিনীর মনে হয়েছিল, “ওরা কি এমন কিছু জানে, যা আমি জানি না?” পরে বুঝলেন, বিষয়টা তা নয়। ‘ওরা বেশি জানে’ নয়, ‘ওরা আগে কথা বলে’ ! হরিনীর উপলব্ধির জায়গাটা এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর সহকর্মীরা সব প্রশ্নের উত্তর জানেন না। তাঁদের কাছে এমন কোনও অতিরিক্ত জ্ঞানও নেই, যা তাঁর কাছে নেই। তফাতটা অন্য জায়গায়। তাঁরা সব উত্তর হাতে পাওয়ার অপেক্ষা করেন না।
একটি ধারণা মাথায় এসেছে—বললেন। কোনও বিষয়ে সন্দেহ হয়েছে—প্রশ্ন করলেন। কোনও সম্ভাবনা মনে হয়েছে—আলোচনায় তুললেন।
অন্য দিকে হরিনীর মতো অনেকেই ভাবেন, আগে বক্তব্যকে নিখুঁত করে নিতে হবে। প্রতিটি তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনও ফাঁক রাখা যাবে না। তারপর বলা যাবে। এই অপেক্ষার মধ্যেই অনেক সময় সুযোগটা চলে যায়।
একটি ধারণা মুখে না আনলে, তার জন্মই বা হবে কী ভাবে? হরিনীর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল—কোনও ধারণা যতক্ষণ মাথার ভিতরে থাকে, ততক্ষণ সেটি অন্য কারও কাজে লাগার সুযোগ নেই। হয়তো ধারণাটি সম্পূর্ণ নয়। হয়তো তাতে ভুল আছে। কিন্তু সেটি আলোচনায় এলে অন্য কেউ সেটিকে সংশোধন করতে পারেন, আরও ভাল কোনও পরামর্শ দিতে পারেন। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন পরিকল্পনা। কিন্তু ‘আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই’ বলে যদি কেউ চুপ করে থাকেন, সেই সম্ভাবনাটাই সামনে আসে না। হরিনী জানিয়েছেন, তিনি ধীরে ধীরে এই জায়গাটিই বদলানোর চেষ্টা করেছেন।
তবে আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে হরিনীর বক্তব্যকে ভুল ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেননি, সব কিছু না জেনেও সব কিছু জানার ভান করতে হবে। বরং তাঁর উপলব্ধি আরও সূক্ষ্ম—নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করেও আত্মবিশ্বাসী হওয়া যায়। কোনও বিষয়ে জানেন না? বলতে পারেন, “আমি জানি না।” কোনও বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন? বলতে পারেন, “আমার ধারণা এমন, তবে আরও দেখে নিতে হবে।” অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস মানে নিজের ভুলকে ঢেকে রাখা নয়। বরং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা জেনেও নিজের বক্তব্য সামনে রাখার সাহস।
কর্মক্ষেত্রে অনেকেই একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের অপেক্ষা করেন—যখন কথাটা একেবারে নিখুঁত ভাবে বলা যাবে। কী ভাবে বলবেন, কোন শব্দ ব্যবহার করবেন, অন্যরা কী ভাববেন—এই সব ভাবতে ভাবতেই হয়তো মিটিং এগিয়ে যায়। হরিনীর অভিজ্ঞতা বলছে, সব সময় সেই ‘নিখুঁত মুহূর্ত’ আসে না। বরং অনেক সময় যে ব্যক্তি আগে নিজের ভাবনাটা প্রকাশ করেন, তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই পরের আলোচনা তৈরি হয়। অন্যরা যোগ করেন, ভুল ধরেন, সংশোধন করেন, নতুন তথ্য দেন। ফলে প্রথম কথাটিই শেষ কথা নয়। প্রথম কথাটিই অনেক সময় আলোচনার দরজা খুলে দেয়।
হরিনীর কাছে এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—confidence বা আত্মবিশ্বাস কোনও জন্মগত গুণ নয়। এটি একটি দক্ষতা, যা শেখা যায়। আগে তাঁর ধারণা ছিল, কিছু মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই আত্মবিশ্বাসী। তাঁরা সহজে মানুষের সামনে কথা বলেন, নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন, ভুলকে ভয় পান না। অন্যরা হয়তো স্বভাবগত ভাবেই চুপচাপ। কিন্তু আমেরিকায় কাজ করতে গিয়ে তাঁর ধারণা বদলায়। নিজের কথা বলা, প্রশ্ন করা, আলোচনায় অংশ নেওয়া—এসব যত বেশি করা যায়, ততই ভয় এবং অস্বস্তি কমতে পারে। অর্থাৎ আত্মবিশ্বাসও অন্য যে কোনও দক্ষতার মতো অনুশীলনের মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব।
হরিনীর অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত কর্মজীবনের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি বড় সামাজিক প্রশ্নও। ছোটবেলা থেকেই বহু ভারতীয় পরিবারে শিশুদের শেখানো হয়—ভুল উত্তর দেওয়া যাবে না, বড়দের কথার মাঝখানে কথা বলা যাবে না, আগে ভাল করে শুনতে হবে, তারপর বলতে হবে। এই শিক্ষা শৃঙ্খলা তৈরি করে। কিন্তু তার অন্য একটি দিকও থাকতে পারে—ভুল বলার ভয়। ফলে বড় হওয়ার পরেও অনেকেই মিটিংয়ে কথা বলার আগে ভাবেন, “আমার কথাটা যদি ভুল হয়?” “সবাই যদি হাসে?” “বস যদি মনে করেন আমি কিছু জানি না?” অন্য কেউ সেই ভয়কে গুরুত্ব না দিয়েই কথা বলে ফেলেন। ফল? কখনও কম জানা মানুষটিই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।
হরিনীর বক্তব্য সমাজমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর বহু মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছেন। কেউ লিখেছেন, তাঁর কথার সঙ্গে একেবারে একমত। কেউ বলেছেন, তাঁদেরও ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছিল—পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। আবার কেউ সরাসরি মন্তব্য করেছেন, “Confidence is a skill.” অর্থাৎ হরিনীর অভিজ্ঞতা একা তাঁর নয়। কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা তৈরি করতে গিয়ে বহু মানুষ একই সমস্যার মুখোমুখি হন—যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিজের বক্তব্য সামনে রাখার সংকোচ।
তবে এখানে একটি ভুল ধারণা এড়ানো জরুরি। আত্মবিশ্বাস মানে মিটিংয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলা নয়। অন্যকে থামিয়ে নিজের কথা চাপিয়ে দেওয়াও নয়। বরং আত্মবিশ্বাসের অর্থ হতে পারে—প্রয়োজনে প্রশ্ন করা। নিজের মতামত জানানো। ভুল হলে তা স্বীকার করা। না জানলে ‘জানি না’ বলা। আর কোনও ধারণা অসম্পূর্ণ হলেও সেটিকে আলোচনার টেবিলে রাখার সাহস দেখানো। সত্যিকারের আত্মবিশ্বাস হয়তো সেখানেই—নিজেকে প্রমাণ করার জন্য অন্যকে ছোট করার প্রয়োজন না থাকা।
হরিনীর গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, আমেরিকায় গিয়ে তিনি শুধু একটি নতুন কর্মসংস্কৃতি দেখেননি। তিনি নিজের ভিতরে থাকা একটি পুরনো অভ্যাসকে নতুন করে চিনেছেন। তিনি বুঝেছেন, এত দিন ‘প্রস্তুত’ হওয়ার নামে তিনি হয়তো অতিরিক্ত সময় নিচ্ছিলেন। সব উত্তর জোগাড় করার অপেক্ষায় নিজের প্রশ্নটিই হয়তো করে উঠছিলেন না। আর সেই উপলব্ধিই বদলে দিয়েছে তাঁর কাছে আত্মবিশ্বাসের অর্থ।
সব জানা থাকলেই আত্মবিশ্বাসী হওয়া যায়—এ ধারণা নয়। বরং সব জানা নেই, তবু শেখার পথে প্রথম কথাটা বলার সাহস রাখাই আত্মবিশ্বাস। শেষ পর্যন্ত হরিনীর আমেরিকা-অভিজ্ঞতা যেন একটি সহজ প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি সত্যিই কম জানি বলে চুপ থাকি, নাকি ভুল বলার ভয়েই চুপ করে থাকি?