মুম্বই, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: একটি ফোন। কয়েক হাজার টাকার মাসিক কিস্তি। বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক। তার পর রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে পড়া। সামনে ২০০ ফুট গভীর খাদ। পিছনে অসহায় বাবা-মা। তিন ঘণ্টা ধরে বোঝানোর চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে টেনে সরাতে গিয়ে বাবাও পড়লেন খাদে। সেই দৃশ্য দেখে মা-ও ঝাঁপ দিলেন। একই সঙ্গে মৃত্যু হল বাবা, মা ও ১৮ বছরের তরুণ কুণালের।
মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের তিসগাঁও এলাকার খাভদ্যা পাহাড়ের এই ঘটনা নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়। অন্তত ঘটনাটির পটভূমি সেই প্রশ্নই তুলছে। একটি দামি স্মার্টফোন কেনা, তার কিস্তি কে দেবেন, এই সামান্য বিষয় কী ভাবে মুহূর্তের আবেগে একটি পরিবারকে এমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, তা ভাবাচ্ছে মনোবিদ থেকে সমাজবিদ—সকলকেই।
কুণালের হাতে ছিল আইফোন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত। বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ফোনের কিস্তি দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ছেলে তাতেও অনড়। কিস্তি না দিলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি। কয়েক দিন ধরে চলছিল চাপানউতোর। সেই বিবাদ চরমে পৌঁছয়। বাড়ি ছেড়ে পাহাড়ে চলে যান কুণাল। বাবা-মাও পিছনে পিছনে সেখানে পৌঁছন। তার পরের তিন ঘণ্টা যেন এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক নাটক।
পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে কুণাল। এক পা এগোলেই খাদ। মা দূর থেকে বার বার বলছেন, ‘‘এ দিকে চলে আয় বাবা।’’ ছেলে পাল্টা হুমকি দিচ্ছেন—কেউ এগোলেই ঝাঁপ দেবেন। বাবা-মা জানেন, তাঁকে জোর করে ধরতে গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। তাই কথা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা। পাশে দাঁড়িয়ে গ্রামবাসীরাও অপেক্ষা করছেন। এই দৃশ্যটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের সময়ের একটি বড় প্রশ্ন—কেন একটি তরুণ এত দ্রুত ‘সব অথবা কিছুই নয়’-এর সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছে?
কুণালের মানসিক অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। তাঁর কোনও মানসিক অসুস্থতা ছিল কি না, সেটিও জানা নেই। কিন্তু ঘটনাটি একটি প্রবণতার দিকে নজর ফেরায়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণ না হলে তীব্র হতাশা, অপমানবোধ বা রাগকে জীবনের শেষ সত্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা কেন বাড়ছে?
স্মার্টফোন এখানে শুধু একটি বস্তু নয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে ফোন এখন পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, বন্ধুত্ব, বিনোদন, কাজ—সব কিছুর সঙ্গে জড়িত। বিশেষ ব্র্যান্ডের ফোন হয়ে উঠতে পারে ‘স্ট্যাটাস’-এর প্রতীক। ফলে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য যখন সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন সংঘাতটা আর শুধু টাকা-পয়সার থাকে না। তা হয়ে ওঠে ‘আমাকে বোঝা হচ্ছে না’ বনাম ‘আমাদের সামর্থ্য নেই’—এই দুই মানসিকতার সংঘর্ষ। আর সেই জায়গাতেই আবেগের বিপদ।
কিশোর বা তরুণ বয়সে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিচার করার ক্ষমতা এখনও সম্পূর্ণ পরিণত হয় না—মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় এই বিষয়টি বহু বার উঠে এসেছে। প্রবল রাগ, অপমান, প্রত্যাখ্যান বা হতাশার মুহূর্তে মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যার পরিণতি কয়েক মিনিট পরেই নিজেই বদলাতে চাইবে। কিন্তু বিপজ্জনক জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্তই হয়ে উঠতে পারে চিরস্থায়ী।
কুণালের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—হুমকি এবং বাস্তব বিপদের মাঝের সীমারেখা। তিনি বার বার ঝাঁপ দেওয়ার কথা বলছিলেন। পরিবারের লোকজন এবং গ্রামবাসীরা তিন ঘণ্টা ধরে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাবা সম্ভবত মনে করেছিলেন, এবার ছেলেকে শারীরিক ভাবে সরিয়ে নেওয়াই একমাত্র উপায়। সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। অর্থাৎ আত্মহত্যার হুমকিকে ‘রাগের কথা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনই এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ শারীরিক ভাবে ধরে ফেলার চেষ্টাও বিপজ্জনক হতে পারে।
এখানেই পরিবারের ভূমিকা নিয়ে আরও একটি কঠিন প্রশ্ন আসে। সন্তান কোনও দামি জিনিস চাইলে ‘না’ বলা ভুল নয়। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে চাহিদা পূরণ করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। কিন্তু ‘না’ বলার ধরনটিও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের চাহিদাকে অস্বীকার করা এবং সন্তানকে অস্বীকার করা—দুটি এক জিনিস নয়। ‘‘এই ফোনটা এখন কিনে দিতে পারব না’’-র সঙ্গে ‘‘তুমি কিছুই বোঝ না’’—এই দুই কথার মানসিক অভিঘাত এক নয়।
একই ভাবে তরুণদেরও বুঝতে হবে—পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ব্যক্তিগত অপমান নয়। একটি ফোন না পাওয়া, কোনও ব্র্যান্ড ব্যবহার করতে না পারা, বন্ধুর চেয়ে কম দামি ফোন থাকা—এসব জীবনের ব্যর্থতা নয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অন্যের ‘সেরা জীবন’-এর ছবি দেখতে দেখতে নিজের জীবনকে ছোট মনে হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আজকের ঘটনা তাই শুধু আইফোনের কিস্তির গল্প নয়। এটি চাহিদা বনাম সামর্থ্য, আবেগ বনাম যুক্তি, এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বনাম দীর্ঘ জীবনের সংঘাতের গল্প।
তবে কুণালের মৃত্যুর দায়কে শুধু ‘তরুণ প্রজন্মের হঠকারিতা’ বলে শেষ করে দেওয়া ঠিক হবে না। একটি ১৮ বছরের ছেলে কেন এমন চরম অবস্থায় পৌঁছল, তার উত্তর খুঁজতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং ডিজিটাল সংস্কৃতি—সব কিছুকেই দেখতে হবে। একই সঙ্গে বাবা-মায়েদেরও বুঝতে হবে, সন্তান যখন বলে ‘‘আমি আর থাকতে চাই না’’ বা ‘‘আমি ঝাঁপ দেব’’, তখন সেটিকে নিছক রাগ বা আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেই মুহূর্তে তর্ক নয়, নিরাপত্তাই প্রথম। প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত পেশাদারের সাহায্য নিতে হবে।
কুণালের পরিবার সেই মুহূর্তে কী করতে পারত, তার নিশ্চিত উত্তর দেওয়া এখন কঠিন। পাহাড়ের ধারে তিন ঘণ্টা ধরে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এই মৃত্যু আমাদের অন্তত একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে— একটি ফোনের দাম যতই বেশি হোক, তার কিস্তির চেয়ে কি একটি জীবনের মূল্য কম? উত্তরটি সকলেরই জানা। কিন্তু সেই উত্তরটি যেন রাগের মুহূর্তে ভুলে না যাই, এই শিক্ষাই রেখে গেল মহারাষ্ট্রের মর্মান্তিক ঘটনা।