কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: গল্প বলার জাদুতে বিশ্বের কোটি কোটি পাঠককে বেঁধে রেখেছিলেন তিনি। ভারতীয় পাঠকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল যেন আরও একটু আপন। ফুটপাথের স্টল থেকে বইমেলার ভিড়, জেফ্রি আর্চারের নাম দেখলেই এক সময় উপচে পড়ত পাঠকের ভিড়। সেই জনপ্রিয় ব্রিটিশ লেখক আর নেই। সোমবার ৮৬ বছর বয়সে নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। এ দিকে মৃত্যুর ঠিক পরের দিনই অর্থাৎ ৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শেষ উপন্যাস ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’। জীবনের শেষ বইটি প্রকাশের আগে লন্ডনের লেস্টার স্কোয়ার থিয়েটারে রবিবার একটি সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানে পাঠকদের জন্য বইয়ে সইও করেছিলেন তিনি। ছিল ভারত সফরের পরিকল্পনাও। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন বইয়ের প্রচারে এ দেশে আসার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। প্রকাশকের তরফে জানানো হয়েছে, স্ত্রী ডেম মেরি আর্চার, দুই ছেলে এবং তিন নাতি রেখে গিয়েছেন তিনি। পাঁচ দশকের লেখক জীবনে মোট ৫৯টি বই লিখেছেন আর্চার। তার মধ্যে ৩১টি উপন্যাস, সাতটি ছোটগল্পের সংকলন এবং তিনটি নাটক। তাঁর বই বিশ্ব জুড়ে ১১৯টি দেশে ৪৯টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এবং বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি কপি।
ভারতের সঙ্গে আর্চারের সম্পর্ক অবশ্য শুধু বিপুল বিক্রির হিসাব দিয়ে বোঝানো যায় না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, অন্য যে কোনও দেশের আগে ভারতেই তাঁর বই পৌঁছে যেত। কারণ, ব্রিটেনে বই প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই দিল্লি বা মুম্বইয়ের ফুটপাথ এবং ট্রাফিক সিগন্যালের পাশে তার নকল সংস্করণ হাজির হয়ে যেত। বিষয়টি নিয়ে বিরক্তির বদলে ভারতীয় পাঠকদের প্রতি তাঁর ছিল এক ধরনের মমতা। নিজেই বলেছিলেন, “ভারতীয়রা এবং আমি সব সময়ই স্বাভাবিক বন্ধু।” ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তাঁর ‘ক্লিফটন ক্রনিকলস’ সিরিজের বই ব্রিটেন ও আমেরিকায় প্রকাশের আগেই ভারতের বাজারে চলে এসেছিল। যা প্রকাশনা জগতে কার্যত ব্যতিক্রমী ঘটনা। ২০০৯ সালে ‘পাথস অফ গ্লোরি’ বইয়ের প্রচারে প্রথম বার ভারতে আসেন তিনি। গুরগাঁও, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, লখনউ, চেন্নাই এবং পুনে-সহ ৬ শহরে ঘুরে পাঠকদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরের বছর ফের ভারতে এসে ‘অ্যান্ড দেয়ারবাই হ্যাংস আ টেল’ বইয়ের প্রচার করেন। সেই বইয়ে জাতপাতের বাধা অগ্রাহ্য করে বিয়ে করা এক ভারতীয় দম্পতির গল্পও ছিল। তাঁর সফরের স্মৃতি আজও ভারতীয় প্রকাশনা মহলে উজ্জ্বল। প্রথম গুরগাঁও অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০০ জন হাজির হয়েছিলেন। বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ে প্রতিদিন বইয়ে সই করাতে এসেছিলেন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষ। ২০১৯ সালে জয়পুর সাহিত্য উৎসবে তাঁর বক্তৃতা শুনতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল। তাঁর গল্পের মধ্যে যে বলিউড-সুলভ নাটকীয়তা ছিল, সেটিই সম্ভবত ভারতীয় পাঠকদের এতটা টেনেছিল।
আর্চারের কাহিনি অবশ্য শুধু সাফল্যের নয়, উত্থান-পতনেরও। ১৯৪০ সালের ১৫ এপ্রিল জন্ম তাঁর। সেনাবাহিনীতে অল্প সময় কাজ করার পর মেট্রোপলিটন পুলিশের শিক্ষানবিশ কনস্টেবল, আমেরিকায় শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ এবং হ্যাম্পশায়ারের একটি স্কুলে শিক্ষকতা—জীবনের প্রথম পর্বে নানা ধরণের কাজ করেছেন তিনি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় রসায়নের ছাত্রী মেরির, যাঁকেই পরে বিয়ে করেন। রাজনীতিতেও পা রেখেছিলেন আর্চার। কনজ়ারভেটিভ পার্টির কাউন্সিলর হওয়ার পর ১৯৬৯ সালে লিঙ্কনশায়ারের লাউথ কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৪ সালে একটি প্রতারণায় বিপুল অর্থ হারিয়ে দেনা হয়ে যাওয়ার পর সংসদীয় রাজনীতি ছাড়তে হয় তাঁকে। আর্থিক বিপর্যয়ের সেই সময়ই লেখালেখির দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘নট আ পেনি মোর, নট আ পেনি লেস’। তার দু’বছর পর ‘কেন অ্যান্ড অ্যাবেল’ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। পরে ‘ফার্স্ট অ্যামং ইকুয়ালস’, ‘ক্লিফটন ক্রনিকলস’ এবং ‘উইলিয়াম ওয়ারউইক’ সিরিজ তাঁকে বেস্টসেলারের তালিকায় স্থায়ী জায়গা করে দেয়। তবে বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। ১৯৮৭ সালে ‘ডেইলি স্টার’-এর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বিপুল ক্ষতিপূরণ জেতেন তিনি। পরে সেই ঘটনাই অন্য মোড় নেয়। ২০০১ সালে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন আর্চার। ৪ বছরের সাজা হলেও প্রায় দু’বছর কারাবাস করেন। জেলের অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন তিন খণ্ডের ‘এ প্রিজ়ন ডায়েরি’, যেখানে কল্পকাহিনির বদলে উঠে আসে কারাগারে দেখা বাস্তব মানুষের জীবন।
কারাগার থেকে বেরিয়েও থামেননি আর্চার। বরং আরও জোরে ফিরে এসেছিলেন লেখার টেবিলে। ‘ক্লিফটন ক্রনিকলস’-এর সাতটি বইয়ের পর ‘উইলিয়াম ওয়ারউইক’ সিরিজও পাঠকদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয় হয়। ১৯৯২ সালে পাওয়া ব্রিটিশ অভিজাত উপাধি ধরে রেখেছিলেন তিনি, যদিও ২০২৪ সালে হাউস অফ লর্ডস থেকে অবসর নেন। মৃত্যুর আগে ভারতীয় পাঠকদের জন্যও রেখে গিয়েছেন এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার। ২০২৫ সালে তাঁর ছ’টি উপন্যাসকে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সিরিজে রূপ দেওয়ার জন্য অ্যাপ্লজ় এন্টারটেনমেন্টের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। ভারতীয় লেখক অমীশ ত্রিপাঠীর সঙ্গে মিলে গল্প বলার জন্য ‘আর্চার অমীশ অ্যাওয়ার্ড ফর স্টোরিটেলার্স’-ও চালু করেছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভাল গল্পের কোনও অভিজাত সীমানা নেই। আর ভারতীয় পাঠকদের কাছে সেই কথার অর্থ ছিল আরও গভীর। শেষ উপন্যাস ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’-এর ভূমিকায় তাই বিদায়ের সুর স্পষ্ট। লিখেছিলেন, পাঁচ দশক গল্প বলার পর এবার শেষ উপন্যাস লেখার সময় এসেছে। ১১৯টি দেশের পাঠকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন বিদায়ের কথা। সেই বিদায় যেন এখন আরও ভারী। বইয়ের পাতায় তাঁর চরিত্ররা বেঁচে থাকবে, আর ভারতের অসংখ্য পাঠকের স্মৃতিতে থেকে যাবেন সেই লেখক। যাঁর গল্পের টান এক সময় বইয়ের দোকান থেকে ফুটপাত, সাহিত্য উৎসব থেকে সিনেমার পর্দা, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।
