নয়াদিল্লি: ক্যানসারের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এ বার হৃদরোগ ও কিডনির চিকিৎসায় ব্যবহৃত দামি ওষুধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুরক্ষার দাবি তুলল কর্নাটক সরকার। রাজ্যের বক্তব্য, ক্যানসারের মতোই হৃদযন্ত্র ও কিডনির জটিল অসুখের চিকিৎসাতেও বিপুল খরচের বোঝা বইতে হয় সাধারণ মানুষকে। তাই জীবনদায়ী ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের আওতা আরও বাড়ানো জরুরি। হাসপাতাল ও ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্রয়মূল্য এবং রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া দামের মধ্যে বড় ফারাক থাকার অভিযোগ সামনে আসার পর এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
সম্প্রতি কেন্দ্র ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মুনাফার সীমা সর্বোচ্চ খুচরো বিক্রয়মূল্য বা এমআরপির ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্তে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। যে ওষুধগুলি সরকারের নির্ধারিত মূল্যসীমার আওতায় নেই, নতুন ব্যবস্থা মূলত সেগুলির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তবে কোন কোন ওষুধ এই নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসবে, তার চূড়ান্ত তালিকা এখনও তৈরি হয়নি। কর্নাটক সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ শুধু ক্যানসারের ওষুধে সীমাবদ্ধ না রেখে হৃদরোগ, কিডনির অসুখ এবং অন্যান্য গুরুতর রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত দামি ওষুধের ক্ষেত্রেও কার্যকর করা হোক।
২৫৩টি ওষুধের দামে অসঙ্গতির অভিযোগ
কর্নাটকের খাদ্য সুরক্ষা ও ওষুধ প্রশাসন দফতরের পরিদর্শনে ওষুধের ক্রয়মূল্য এবং গায়ে ছাপা এমআরপির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফারাকের বিষয়টি সামনে এসেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, পরীক্ষা করে ২৫৩টি ওষুধের দামে বড় ধরনের অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের এমআরপি হাসপাতালের ক্রয়মূল্যের ১০ গুণেরও বেশি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেই ফারাক ৫২ গুণ ছাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ।
রাজ্যের অভিযোগ, ওষুধ প্রস্তুতকারী বা সরবরাহকারী সংস্থার কাছ থেকে হাসপাতালগুলি অনেক সময় ছাড়ে ওষুধ কেনে। কিন্তু রোগীদের বিল করার সময় সেই ওষুধের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরো দাম, অর্থাৎ এমআরপি অনুযায়ী বা তার কাছাকাছি দাম নেওয়া হয়। ফলে হাসপাতালের প্রকৃত ক্রয়মূল্য এবং রোগীর দেওয়া টাকার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসায় নিয়মিত দামি ওষুধ কিনতে হলে এই ফারাক রোগী ও তাঁর পরিবারের উপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় হাসপাতালের বিলেও স্বচ্ছতা আনার দাবি জানিয়েছে কর্নাটক। রাজ্যের প্রস্তাব, রোগীদের দেওয়া বিলে ওষুধের ক্রয়মূল্য এবং এমআরপি—দু’টিই স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। তাতে রোগীরা বুঝতে পারবেন, কোনও ওষুধ হাসপাতাল কত দামে কিনেছে এবং তাঁদের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ঘিরে নতুন বিতর্ক
জীবনদায়ী ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কর্নাটক সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের এমআরপি কেন খুচরো বিক্রেতার জন্য নির্ধারিত দামের ১৬ শতাংশের বেশি হতে পারবে না, সেই ধরনের সীমা আরও বিস্তৃত করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বর্তমান ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত ওষুধের ক্ষেত্রে সরকার মূল্যসীমা নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই তালিকার বাইরে থাকা বহু দামি ওষুধের ক্ষেত্রে একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই।
কর্নাটকের দাবি, এই ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দূর করতে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের নিয়ম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। দামি ক্যানসারের ওষুধের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও কিডনির চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। ওষুধের বাণিজ্যিক মুনাফার সীমা নির্ধারণ, হাসপাতালের বিলের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নজরদারি জোরদার করার মতো পদক্ষেপও জরুরি বলে মনে করছে রাজ্য।
ক্যানসারের ওষুধে কতটা স্বস্তি মিলতে পারে?
কেন্দ্রের নতুন উদ্যোগে ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মুনাফা এমআরপির ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের অনুমান, এর ফলে কিছু ওষুধের দাম সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে এবং রোগীদের বছরে মোট প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। তবে এই সম্ভাব্য সাশ্রয় নির্ভর করবে চূড়ান্ত তালিকায় কোন ওষুধগুলি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবং নতুন নিয়ম কী ভাবে কার্যকর হচ্ছে, তার উপর।
কর্নাটক সরকার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তাদের বক্তব্য, চিকিৎসার খরচ কমাতে শুধু ক্যানসারের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। হৃদরোগ ও কিডনির জটিল অসুখেও বহু রোগীকে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ কিনতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খরচও পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই আরও বেশি জীবনদায়ী ওষুধের ক্ষেত্রে মূল্য নিয়ন্ত্রণ চালু করা গেলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।
ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হাসপাতালগুলিতে স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা চালু করা এবং ওষুধের সরবরাহ ব্যবস্থায় নিয়মিত নজরদারির উপরও জোর দিচ্ছে কর্নাটক। রাজ্যের মতে, ওষুধের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও রোগীর কাছ থেকে নেওয়া দামের ফারাক স্পষ্ট হলে অস্বাভাবিক মুনাফা চিহ্নিত করা সহজ হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় স্তরে সমন্বিত নীতি তৈরি করাও জরুরি।
এখন নজর কেন্দ্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে ঘোষিত মূল্যনিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগ, কিডনি এবং অন্যান্য জটিল অসুখের ওষুধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে কর্নাটকের দাবি, চিকিৎসার খরচ কমাতে ওষুধের দাম ও হাসপাতালের বিলিং, দুই ক্ষেত্রেই আরও কঠোর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
