লর্ড হাও আইল্যান্ড: একটি জাহাজ দুর্ঘটনা। সেখান থেকে পালিয়ে আসা কয়েকটি ইঁদুর। আর তার পর প্রায় এক শতক ধরে বদলে গেল একটি গোটা দ্বীপের প্রকৃতি। ঘটনাটি 1918 সালের। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় 600 কিলোমিটার দূরে বিচ্ছিন্ন আগ্নেয় দ্বীপ লর্ড হাও আইল্যান্ড। সেখানে জাহাজডুবির পর ঢুকে পড়েছিল কালো ইঁদুর। একশো বছরেরও বেশি সময় পরে বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখছেন, সেই ছোট্ট দুর্ঘটনার প্রভাব কতটা বড় হয়েছিল।
1918 সালের জুনে SS Makambo নামে একটি স্টিমশিপ লর্ড হাও দ্বীপের কাছে আটকে যায়। জাহাজটি প্রায় ন’দিন সেখানে আটকে থাকার সময় বেশ কিছু কালো ইঁদুর (Rattus rattus) জাহাজ থেকে দ্বীপে পালিয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে আগে কোনও স্থানীয় স্তন্যপায়ী শিকারি ছিল না। ফলে নতুন পরিবেশে ইঁদুরের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। তার পর শুরু হয় ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া এক বাস্তুতন্ত্রের গল্প।
ইঁদুর শুধু খাবারের প্রতিযোগী ছিল না। তারা দ্বীপের পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য ছোট প্রাণীর উপরও শিকারি হিসেবে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সরকারি সংরক্ষণ-নথি অনুযায়ী, 1918 সালে আসার পর এই ইঁদুর অন্তত পাঁচটি স্থানীয় পাখি-গোষ্ঠীর বিলুপ্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল। একাধিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর সংখ্যাও কমে যায়।
ইঁদুরের দাপট কতটা বেড়েছিল, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় পুরনো নথি থেকেই। 1927 সালে ইঁদুর নিধনের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হলে দ্বীপবাসীরা 13,771টি ইঁদুরের লেজ জমা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ কয়েকটি জাহাজি ইঁদুরের হাত ধরে শুরু হওয়া উপদ্রব তত দিনে দ্বীপের বড় পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু আসল চমক মিলেছে আরও পরে। দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ-প্রচেষ্টার পর 2019 সালে লর্ড হাও দ্বীপে ইঁদুর এবং ইঁদুরজাতীয় অন্যান্য আগ্রাসী প্রাণী নির্মূলের বড় কর্মসূচি নেওয়া হয়। তার পর বিজ্ঞানীরা দু’বছর ধরে গাছের গুঁড়ি, পাতার স্তর এবং মাটির কাছাকাছি থাকা অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের উপর নজর রাখেন। উদ্দেশ্য ছিল—ইঁদুর চলে যাওয়ার পরে প্রকৃতি সত্যিই কতটা বদলাচ্ছে, তা বোঝা।
ফলাফল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইঁদুর নির্মূলের পর দ্বীপের অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। একটি পর্যবেক্ষণে মোট সংখ্যার হিসাব 9,380 থেকে বেড়ে 14,829-এ পৌঁছয়। তবে প্রজাতির বৈচিত্র্যে একই রকম বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। অর্থাৎ, মাটির নীচে বা পাতার স্তরের আড়ালে প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে নিজের পুরনো ভারসাম্য ফিরে পাচ্ছে।
গবেষকদের কাছে এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল। মূল ভূখণ্ডের মতো সেখানে নতুন কোনও প্রজাতি সহজে এসে পরিবেশের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে না। ফলে বাইরে থেকে আসা একটি আগ্রাসী প্রাণী ঢুকে পড়লে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। লর্ড হাওয়ের ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।
তবে ইঁদুর নির্মূল করলেই সব সমস্যা মিটে যায়নি। শতাব্দী ধরে যে প্রাণীগুলি ইঁদুরের শিকারে কমে গিয়েছে বা হারিয়ে গিয়েছে, তাদের ফিরে আসা সহজ নয়। আবার পরিবেশ, জলবায়ু এবং খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যান্য পরিবর্তনও পুনরুদ্ধারের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বিজ্ঞানীদের নজর এখনও রয়েছে দ্বীপটির উপর।
আর রয়েছে নতুন করে ইঁদুর ঢুকে পড়ার আশঙ্কাও। দ্বীপের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন সরবরাহ অনেকটাই জাহাজনির্ভর। ফলে বাইরে থেকে আবার কোনও ইঁদুর ঢুকে পড়লে এক শতাব্দীর সংরক্ষণ-প্রচেষ্টা বিপদের মুখে পড়তে পারে। সেই কারণেই এখন দ্বীপে কড়া বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা, ফাঁদ, ক্যামেরা এবং প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে নজরদারি চালানো হয়।
1918 সালের সেই জাহাজডুবি তাই আজ আর নিছক পুরনো দুর্ঘটনার গল্প নয়। একটি ছোট প্রাণীর অনিচ্ছাকৃত আগমন কী ভাবে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের জীববৈচিত্র্যকে এক শতাব্দী ধরে বদলে দিতে পারে, লর্ড হাও আইল্যান্ড তার জীবন্ত উদাহরণ। আর 2019-এর পর মাটির পাতার স্তরে ফিরে আসা হাজার হাজার অমেরুদণ্ডী প্রাণী দেখাচ্ছে, সুযোগ পেলে প্রকৃতি হয়তো ধীরে ধীরে নিজের ক্ষতও সারাতে পারে।
