নিউজ ডেস্ক: বাঙালির চিরাচরিত দুর্গাপূজার চেনা ব্যাকরণ কি তবে বদলাতে শুরু করেছে? মহালয়ার পুণ্যলগ্নে যেখানে রেডিওর সুরে দেবী আবাহনের তন্ময়তা ছড়ানোর কথা, সেখানে দেখা গেল একেবারে উল্টো ছবি। খোদ কলকাতার বুকে, ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্স সংলগ্ন চত্বরে সরকারি অর্থানুকূল্যে আয়োজিত জল-উৎসবে দেবীর আবাহনী সুর নিমেষেই বদলে গেল বিসর্জনের উত্তাল নাচে। ঘটস্থাপনা আর বোধনের আগেই বিসর্জনের এমন প্রকাশ্য উদযাপন ঘিরে শহরজুড়ে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তরজা। এই বেনজির আবহ নিয়েই এবার সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে সরব হলেন তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ।
সামাজিক মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কুণাল ঘোষ তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সময়কালে যদি এমন ঘটনা ঘটত, তবে তথাকথিত হিন্দুত্ববাদীরা এতদিন কী করতেন? সনাতন ধর্মের রীতিনীতি লঙ্ঘন নিয়ে যে নেতারা কথায় কথায় ময়দানে নেমে গলা ফাটান, আজ তাঁদের মুখে কোনো শব্দ নেই কেন?'
ইডেনের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে সরকারি উদ্যোগে সমবেত হয়েছিল অজস্র মানুষের ভিড়। গ্রামবাংলা থেকে নিয়ে আসা লোকশিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, একের পর এক মাতৃপ্রতিমার সমাহার সব মিলিয়ে এক বিশাল কার্নিভালের চেহারা নিয়েছিল এলাকাটি। কিন্তু উৎসবের মূল চালিকাশক্তি ও ভাবাবেগ নিয়েই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যে মহালয়া মানে যেখানে চণ্ডীপাঠ ও আগমনীর সুর, সেখানে দেবীপক্ষের সূচনালগ্নেই বেজে উঠল ভাসানের বাজনা। কুণাল ঘোষের বক্তব্য, আবাহনের লগ্নকে এমন বিসর্জনের নৃত্যে পরিণত করা সত্যিই নজিরবিহীন।
সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করে এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন কুণাল ঘোষ। তাঁর মতে, দেবীর আবাহনের শুভলগ্নে এই ধরনের নিরঞ্জন বা বিসর্জনের পরিবেশ তৈরি করা সনাতনী ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। ব্যঙ্গাত্মক সুরে তিনি মন্তব্য করেন, সরকারি খরচে মহালয়ার দিন এমন আয়োজন নাকি তথাকথিত ‘সনাতন ধর্মের খাঁটি ডাক’!
নিজের বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের খোঁচা দিতেও ছাড়েননি তৃণমূল মুখপাত্র। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ঘটনা যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কোনো কর্মসূচিতে ঘটত, তাহলে হিন্দুত্বের স্বঘোষিত প্রবক্তারা এতক্ষণে কী রূপ ধারণ করতেন? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন কিছু ঘটলে এতক্ষণে গেল-গেল রব তুলে নানা তত্ত্ব ও সংলাপের বন্যা বয়ে যেত রাজনীতির অলিন্দে।
একই সঙ্গে তিনি রাজ্যের কার্নিভালের আবহ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সঙ্গে এই আয়োজনের তুলনা টেনে আনেন। সেখানে যখন মা দুর্গার বহু প্রতিমা, সাধারণ মানুষের জমায়েত এবং গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে, তখন ইডেনের এই আয়োজনে আগমনীর সুর বদলে হঠাৎ করে ‘বিসর্জনের নাচ’ হয়ে উঠল যা এককথায় অভূতপূর্ব ও বিভ্রান্তিকর।
কুণাল ঘোষের অভিযোগ, বাংলার সনাতনী দুর্গাপূজার চেনা ছক ও আত্মাকে যেন জোর করে বদলে দেওয়ার এক অদ্ভুত চেষ্টা চলছে। দেবী দুর্গার যে মূর্তির কপালে ঐতিহ্যবাহী ‘ত্রিনয়ন’ বা তৃতীয় নয়নের শান্ত ও তেজস্বী রূপ দেখার কথা, সেখানে আচমকা চারদিকে শুধু ত্রিশূলের প্রদর্শন এবং মহালয়ার দিনে বিসর্জনের আবহ সৃষ্টি হওয়া অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ।
