অভিজিৎ বসু : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের দিন শেষ, না আবার তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন সেটা কে জানে! ভগবান না অন্য কেউ জানেন, তা আমার জানা নেই। এই গভীর রাতেও তাই লিখতে বসে মনে হয়, অগ্নিকন্যার সেই পুরনো ইমেজ কি আবার ফিরে পাবেন তিনি? কে জানে! এই সব বাধা কাটিয়ে তিনি আবার যে জেগে উঠবেন, সেটা বোঝা যাবে আর কিছুদিন পরেই। হয়তো লোকসভা ভোটের আগেই। একে একে তাঁর সাধের তৃণমূলের মা-মাটি-মানুষের সংসারে আগুন লেগেছে বেশ কিছুদিন আগেই। বানরের লেজে আগুন লেগে যেমন বীর রাবণের লঙ্কাপুরী ছারখার হয়েছিল, ঠিক তেমনভাবেই তৃণমূলের ঘর ভাঙল অনেকদিন আগেই রাজ্যে ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের ভরাডুবির পরেই।
এই ভগ্ন হৃদয়ে, আর ভগ্ন তৃণমূলের সেই ভাঙা পায়ের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার হুমকি শুনেই তাঁর দিন কাটে এখন কালীঘাটের বাড়িতে বসে। রাস্তায় বের হলেই যে একদা তাঁর সঙ্গেই দল করা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নানা কটুক্তি শুনতে হয় তাঁকে। সত্যিই কী যে দিন পড়ল, কে জানে! এমন দিন তো লাল পার্টির আমলেও আগে তাঁর কোনও সময় আসেনি। আর এই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্যুতে দিল্লির রাজপথে নামবে সবাই সেখানেই মমতার একজোট হয়ে যাওয়া। দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনে নামা।
কারণ দেশজুড়ে জেন-জিদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেখানে সব রাজনৈতিক দল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এই বিরাট আন্দোলনে একে একে উপস্থিত হচ্ছে। কিছুটা নিজেদের স্বার্থে তো বটেই। বিজেপির বিরুদ্ধে কি আর লড়া যায়? ইডি-সিবিআই আছে না!
কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন অনেকেই। কারণ ইস্যু তো এখন একটাই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করেছেন সবাই। সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দিল্লির রাস্তায় নেমে পড়তে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের আবার। কারণ রাজ্যে এখন তাঁর আর আগের মতো অগ্নিকন্যার ইমেজ নেই। সেই আগুনে ইমেজের উত্তাপে জ্বলে-পুড়ে খাক হয় না কেউ আর না শাসক, না পুলিশ।
শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেও তাঁর সব কাছের লোকজন আজ একদম তাঁকে ছেড়ে অন্য শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন নিজেদের বাঁচাতে। আর বাংলার রাস্তায় বের হলেই যে কত কিছু ঘটে যায়, কে জানে! তাই এখন দিল্লি যাওয়া, আন্দোলনে নামা মমতার কাছে সেটাই হয়তো নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ।
সেই সময় এই দিল্লি যাওয়া মমতার। যে মমতার একা চলার অভ্যাস বেশি। যে মমতার আন্দোলন গড়ে উঠলে তিনি একাই ক্রেডিট নিতে অভ্যস্ত হয়ে যান অতীত তো সেটাই বলে, ইতিহাস বারবার সেই কথাই জানান দিয়ে যায়। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম সবই তো তার সাক্ষী।
সহযোগী আর তাঁর পাশে থাকা দলগুলিকে কি একটু দেখবেন তিনি? কে জানে! এই বিপদে পড়ে কিছুটা হলেও সিপিএম ও কংগ্রেসের নেতাদের কাছে গিয়ে কি একটু হলেও তিনি নিজের মতো করে ভেসে থাকতে চাইছেন? শাসকপক্ষ অবশ্য এমনটাই মনে করে। কিন্তু তাতে কী! মমতাকে আটকাতে শাসককে কত যে প্ল্যান তৈরি করতে হয়, কে জানে এই অন্ধকার রাতেও!
তাঁরা জানেন, এই শূন্য মমতা সিপিএমের থেকেও অনেক বেশি ভয়ংকর। দীপ্সিতা তো তাঁকে রাস্তায় নামতে বলেছেন। আর এটাই যে তাঁকে কিছুটা হলেও অ্যাডভান্টেজ করে রেখে দিয়েছে।
কারণ তিনি মানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলনের মাটি বোঝেন। আন্দোলনের আসল এপিসেন্টার কোথায়, সেটা বোঝেন। শাসকের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে কীভাবে নাস্তানাবুদ করতে হয়, সেটা বোঝেন। ভোট চুরি নিয়ে দেশজুড়ে যে জেন-জিদের প্রতিবাদ মিছিল হচ্ছে, তাতে যোগ দিলে কিছুটা হলেও যে রাজনৈতিক জমি পাওয়া যাবে, সেটা বোঝেন।
তিনিই তো বোঝেন, সিঙ্গুরের সেই তিন ফসলি জমি তাঁকে আন্দোলনের ডিভিডেন্ড দেবেই। তিনি বোঝেন, নন্দীগ্রামের মাটিতে সোনার ফসল ফলবেই। এখন না হয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাঠ্যবই থেকে এইসবকে বাদ দিতে চাইছেন। তাতে কী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে পারবেন? না, মনে হয় না।
তাই মমতার দিল্লি যাত্রা কিন্তু আবার অগ্নিকন্যার সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আর রূপকে সামনে নিয়ে আসতে পারে। একটু হলেও কিন্তু মোদী আর অমিত শাহের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে এমনটাই হয়তো মনে করছেন অনেকে।
