কলকাতা: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে কেন্দ্র করে ফের সরব হলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার ফেসবুক লাইভে এসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন তিনি। একইসঙ্গে তাঁর গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে এনে ফের নির্বাচন করার দাবিও তুলেছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
মমতার বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-এর কারণে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের নাম পুরনো তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এরপর সেই তালিকার ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে নতুন করে ভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। বুধবারের লাইভে মমতা বলেন, "আমার প্রথম দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে। তাঁর যাঁরা মদতদাতা তাঁদের গ্রেফতার দরকার।"
এরপরই ভোটার তালিকা নিয়ে নিজের দ্বিতীয় দাবির কথা জানান তিনি। মমতা বলেন, "যে মানুষের নাম বাদ গেছে পুরনো লিস্ট ফেরাতে হবে। যে যে রাজ্য SIR-এর নামে EVM মেশিন ক্যাপচার করে জিতেছে, সেই রাজ্যগুলিতে আবার নতুন করে পুরনো লিস্টে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।" তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যেই রাজ্যে ফের ভোটের দাবি কার্যত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শুধু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি মমতা। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, "জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি তৈরি হয়েছে। জোর করে বাংলার ভোট লুট করেছে। আপনারা ভোটে জেতেননি। যদি এক ফোঁটা নীতিবোধ থাকে আমাদের নির্বাচন ফিরিয়ে দিন। বিহার, বাংলা, মধ্য প্রদেশে জেতেননি। আমরা আগেও বলেছি কেউ শোনেনি।"
মমতা আরও বলেন, "আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে সময় চাই। সীমা খান্নাকে এক্সপোজ প্রথম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় করে।" এরপরই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ আরও তীব্র হয়। তাঁর দাবি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা আগে কখনও হয়নি।
মমতার আরও বক্তব্য, "সারাদেশে লুট করছে। জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতার হওয়া উচিত। এই চেয়ারটা ওঁর জন্য নয়। এই করেই ২০২৪-এ বিজেপি জিতেছে। জ্ঞানেশ কুমারের জন্য জিতেছে বিজেপি। এমনকী পুলিশকেও মিস ইউস করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সির সহযোগিতায় ভোট লুঠ হয়েছে। ইতনা বড়া ঘোটালা কখনও হয়নি।"
এদিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথা সামনে আসার পরই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বেড়েছে। প্রতিবেদনে SIR-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত ও ভোটার সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হল, কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল।
মমতা তাঁর বক্তব্যে আন্দোলনের ডাকও দিয়েছেন। তিনি বলেন, "জনতা আপনাদের চায় না। আপনি যতদিন চেয়ারে থাকবেন ততদিন আন্দোলন চলবে।" পাশাপাশি তাঁর দাবি, "আপনার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট দিয়েছিলাম। স্পিকার অ্যালাউ করল না। আপনার ইম্পপিচমেন্ট নয়, আপনার গ্রেফতার দরকার।"
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মমতা। তিনি বলেন, "আমায় হাইউ অ্যারেস্ট করে রাখা হয়েছিল। মিটিং মিছিল করতে দেওয়া হয় না। উকিলদের মারছে। ভারতে স্বৈরাচারীদের জায়গা নেই।"
সরকারি সুবিধা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। মমতার অভিযোগ, "আপনারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কেড়েছেন, কৃষকদের ভাতা কেড়েছেন, পেনশেন কেড়েছে, ২ মাস দেবে তারপর আর দেবে না।" পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তাঁর বক্তব্য, "আর পুলিশের ড্রেস পরে বিজেপির ঝাণ্ডা ধরা যায় না। এরা চলে যাবে, আপনাকে পরিবার নিয়ে জীবন কাটাতে হবে।"
শেষে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মমতা বলেন, "বাংলা নবজাগরণের জন্ম দেয়। আমি বলেছিলাম ঝড় উঠবে, ঝড় উঠে গেছে। দিল্লি পড়তেই জ্ঞানেশ ভ্যানিশ হয়ে যাবে। কেউ থাকবে না।"
মমতার এই ধারাবাহিক মন্তব্যের পর SIR, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ল। তবে তাঁর তোলা অভিযোগগুলি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই রয়েছে; নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণ করবে।
