কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের সভাকে ঘিরে ফের রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দিষ্ট শর্ত মেনে ক্যাথিড্রাল রোডে সভা করার কথা ছিল তৃণমূলের। অভিযোগ, সেই নির্দেশেরই একাধিক শর্ত মানা হয়নি। আর সেই অভিযোগকে সামনে রেখে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ারও বার্তা দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে ক্যাথিড্রাল রোডে সভা করে কালীঘাট-তৃণমূল। সভায় উপস্থিত ছিলেন মমতা। সেই সভার ছবি এবং পরিস্থিতি সামনে রেখেই আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, আদালত নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক নিয়ে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং রাস্তার একটি দিক খোলা রেখে সভা করার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই শর্ত মানা হয়নি।
শুভেন্দুর অভিযোগ, সভায় নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় বেশি লোক জড়ো হন। শুধু সভাস্থলের নির্দিষ্ট পরিসরেই নয়, আশপাশের এলাকাতেও কর্মী-সমর্থকদের ভিড় দেখা যায়। তাঁর কথায়, ‘‘দেখুন কী ভাবে হাইকোর্টের অর্ডার ভাঙলেন। গাছের নীচে থাকা লোকদের ডেকে এনে রাস্তা বন্ধ করে দিলেন। এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছি, ওঁর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মুভ করার কথাও বলেছি।’’
শুভেন্দুর এই মন্তব্যের পরেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের নির্দেশের কোন কোন শর্ত ভাঙার অভিযোগ উঠেছে এবং তার ভিত্তিতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে। কারণ, সভার অনুমতি দেওয়ার সময় হাইকোর্ট বেশ কিছু নির্দিষ্ট শর্ত বেঁধে দিয়েছিল।
কী বলেছিল হাইকোর্ট?
তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস পালনকে কেন্দ্র করে দুই তৃণমূল গোষ্ঠীই সভার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানির পর আদালত দুই পক্ষের জন্য পৃথক জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলকে রানি রাসমনি রোডে সভা করার অনুমতি দেওয়া হয়। অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট-তৃণমূলকে ক্যাথিড্রাল রোডের একটি অংশে সভা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে অনুমতির সঙ্গে ছিল একাধিক শর্ত। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনও পক্ষের সভাতেই ১,৫০০-র বেশি কর্মী-সমর্থক উপস্থিত থাকতে পারবেন না। সভাস্থলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল। শুধু লোকসংখ্যাই নয়, সভার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিল আদালত। দুপুর ১২টা থেকে ৩টের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত যাতে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়, সে বিষয়টিও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল।
আদালতের নির্দেশ ছিল, ক্যাথিড্রাল রোড এবং রানি রাসমনি রোডের অন্তত একটি করে দিক যান চলাচলের জন্য খোলা রাখতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সভার কারণে যাতে পুরো রাস্তা অবরুদ্ধ না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল আয়োজক এবং পুলিশের।
সেই নির্দেশের পরেও শুক্রবারের সভাকে ঘিরে রাস্তা আটকে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুভেন্দুর বক্তব্য, সভায় অংশ নিতে আসা কর্মী-সমর্থকদের একাংশ রাস্তার উপরে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ফলে যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয় এবং আদালতের নির্দিষ্ট শর্ত কার্যত লঙ্ঘিত হয়েছে।
মমতার বিরুদ্ধেই কেন এফআইআর? শুভেন্দুর বক্তব্যে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে আসায় বিষয়টি আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং সভার নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফলে প্রশাসনের তরফে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করার প্রস্তুতির কথাই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আদালতের নির্দেশের কোন নির্দিষ্ট শর্ত কী ভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রিপোর্ট এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের উপরই বিষয়টির গতিপথ নির্ভর করবে।
এ ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ভূমিকা নিয়েও নজর থাকবে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, শুধু পুলিশের মাধ্যমে এফআইআর করেই বিষয়টি থামানো হবে না। মমতার বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টেও যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ফলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের সভা শেষ হলেও তার রাজনৈতিক ও আইনি রেশ দ্রুত কাটছে না। এক দিকে দুই তৃণমূল গোষ্ঠীর পৃথক সভা ঘিরে আগেই আদালতের হস্তক্ষেপ, অন্য দিকে সেই নির্দেশ পালনের প্রশ্নে নতুন অভিযোগ—সব মিলিয়ে ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানই এখন রাজ্য রাজনীতির নতুন সংঘাতের কেন্দ্র। আর শুভেন্দুর এফআইআর ও হাইকোর্টে যাওয়ার ঘোষণার পর মমতাকে ঘিরে এই আইনি সংঘাত যে আরও বাড়তে পারে, তারই ইঙ্গিত মিলছে।