মিরাট: প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এবং নৃশংস হত্যার যে কাহিনি গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছিল, সেই মিরাটের ‘নীল ড্রাম’ হত্যাকাণ্ডে বড় রায় দিল আদালত। স্বামী সৌরভ রাজপুতকে খুন এবং অপরাধের প্রমাণ লোপাটের মামলায় স্ত্রী মুসকান রাস্তোগী ও তার প্রেমিক সাহিল শুক্লকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৩ মাসের বিচারপ্রক্রিয়া, ১২৬টি শুনানি এবং ২২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের পর এই সাজা ঘোষণা করল আদালত।
মিরাটের এই হত্যাকাণ্ডের কথা সামনে আসার পর থেকেই দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল। অভিযোগ ছিল, স্বামীকে খুন করার পর তাঁর দেহ টুকরো করে একটি নীল প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে ভরে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন মুসকান ও সাহিল। তদন্তে উঠে আসে, খুনের পর নিজেদের আড়াল করতে নানা পদক্ষেপ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তদন্তকারীদের হাতে আসা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত দু’জনকেই দোষী সাব্যস্ত করে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁদের দোষী ঘোষণা করা হয়েছিল। বুধবার, ১৪ অক্টোবর, সাজা ঘোষণা করা হল।
লন্ডন থেকে ফেরা, তার পরই খুনের অভিযোগ
এই ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন ২৯ বছরের প্রাক্তন মার্চেন্ট নেভি আধিকারিক সৌরভ রাজপুত। মুসকানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল ২০১৬ সালে। তাঁদের একটি মেয়েও রয়েছে। সৌরভ বিদেশে কাজ করতেন। অন্য দিকে, মিরাটে থাকতেন মুসকান। তদন্তকারীদের দাবি, সেই সময়েই সাহিলের সঙ্গে মুসকানের সম্পর্ক তৈরি হয়।
২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে মিরাটে ফেরেন সৌরভ। তার কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটে যায় সেই ভয়াবহ ঘটনা। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ৩ মার্চ স্বামীকে অচেতন করার পর সাহিলের সঙ্গে মিলে তাঁকে খুন করেন মুসকান। তার পর দেহ টুকরো করে নীল ড্রামের মধ্যে লুকিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে দু’জনের বিরুদ্ধে। ড্রামের ভিতরে সিমেন্ট, বালি ও জল ব্যবহার করে দেহাংশ ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
নীল ড্রাম থেকেই সামনে আসে অপরাধ
হত্যার পর দেহ গোপন করার জন্য যে নীল ড্রাম ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। অভিযোগ, ড্রামের ভিতরে দেহাংশ ভরে সিমেন্ট দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাইরে থেকে সহজে কিছু বোঝা না যায়। কিন্তু দেহ পচে যাওয়ার ফলে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
২০২৫ সালের মার্চে সৌরভের পরিবারের তরফে উদ্বেগ প্রকাশের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। বাড়ি থেকে নীল ড্রাম উদ্ধার করা হয়। তার ভিতরেই সৌরভের দেহাংশ পাওয়া যায় বলে তদন্তকারীরা জানান। এরপর মুসকান ও সাহিলকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, ঘটনার পর তাঁরা হিমাচল প্রদেশে5 চলে গিয়েছিলেন।
প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগও প্রমাণিত
তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, সৌরভের ফোন ব্যবহার করে তাঁর পরিবারের কাছে এমন বার্তা পাঠানো হয়েছিল, যাতে মনে হয় তিনি জীবিত রয়েছেন। এর ফলে কিছু সময়ের জন্য পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
বিচার চলাকালীন আদালতে একাধিক সাক্ষীর বয়ান নেওয়া হয়। ড্রাম, সিমেন্ট, বালি এবং অন্যান্য সামগ্রী কেনার সূত্রও খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি ফরেনসিক তথ্য, ফোনের কলের বিবরণ এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রায় ১৩ মাস ধরে চলা শুনানিতে ২২ জন সাক্ষীর বক্তব্যের ভিত্তিতে আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিচার করে।
সৌরভের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান?
সৌরভের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর পরিবার অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। সৌরভের মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে এই মামলা শুধু একটি ফৌজদারি বিচার ছিল না, ছিল প্রিয়জনকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণারও লড়াই। আদালত দু’জনকে দোষী সাব্যস্ত করার পর পরিবারের তরফে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি উঠেছিল। বুধবারের রায়ে সেই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হল।
তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার অর্থ এই নয় যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ। ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন-সহ নির্দিষ্ট আইনি ধাপ রয়েছে। ফলে সাজা ঘোষণার পরেও মামলাটির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
মিরাটের ‘নীল ড্রাম’ হত্যাকাণ্ডে আদালতের এই রায় দেশজুড়ে আলোচিত মামলাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করল। যে ড্রামের ভিতরে সৌরভের দেহ লুকিয়ে অপরাধ গোপন করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে চলে আসে। দীর্ঘ শুনানির পর আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় এখন মামলার পরবর্তী আইনি পর্যায়ের দিকে নজর ঘুরিয়ে দিয়েছে।
