প্রায় পাঁচ দশক আগে পৃথিবী থেকে মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল নাসার দুই ঐতিহাসিক মহাকাশযান 'ভয়েজার-১' এবং 'ভয়েজার-২'। সেই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ করা। তবে এই মহাকাশযানের সঙ্গে এমন এক অমূল্য সম্পদও পাঠানো হয়েছিল, যা আজও মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে চলেছে। আর সেই বার্তাবাহকের অংশ হয়ে রয়েছে ভারতের কিংবদন্তি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী কেসরবাই কেরকরের কণ্ঠ।
১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত 'ভয়েজার-১' ও 'ভয়েজার-২'-তে কোনও মহাকাশচারী ছিলেন না। কিন্তু প্রতিটি মহাকাশযানের সঙ্গে রাখা হয়েছিল একটি বিশেষ ‘ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড’, অর্থাৎ সোনার প্রলেপ দেওয়া তামার তৈরি একটি ডিস্ক। এই রেকর্ডে সংরক্ষিত রয়েছে পৃথিবীর পরিচয় বহনকারী ১১৫টি ছবি, প্রকৃতির নানা শব্দ, ৫৫টি ভাষায় শুভেচ্ছাবার্তা এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী ২৭টি সঙ্গীত। বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি এই গানগুলি নির্বাচন করেছিল। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে যদি কোনও উন্নত ভিনগ্রহী সভ্যতা এই মহাকাশযান খুঁজে পায়, তবে তারা যেন পৃথিবীর মানুষ, সংস্কৃতি, সঙ্গীত এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।
বিশ্বের সেরা ২৭টি সঙ্গীতের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল ভারতের একটি শাস্ত্রীয় সংগীতও। সেটি ছিল কিংবদন্তি শিল্পী কেসরবাই কেরকরের গাওয়া রাগ ভৈরবীর বন্দিশ ‘যাত কাহা হো’। প্রায় তিন মিনিটের এই গানটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীরতা ও সৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। সবথেকে বড় বিষয় হল, এই গান আজও মহাকাশের মহা-দুনিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে কোনও ভিনগ্রহী শ্রোতার সন্ধানে।
কিন্তু কে ছিলেন এই গায়ক? ১৮৯২ সালে গোয়ার এক ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কেসরবাই কেরকর। আধুনিক রেকর্ডিং প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রচার বা বিশ্বব্যাপী পরিচিতির সুযোগ তাঁর জীবনে ছিল না। তবু তাঁর নিখুঁত স্বর, অসাধারণ কণ্ঠশক্তি এবং অনবদ্য পরিবেশনা মুগ্ধ করেছিল আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের। সেই কারণেই মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল তাঁর গান।
আজ প্রায় ৫০ বছর পর ভয়েজার-১ মানবজাতির তৈরি সবচেয়ে দূরে পৌঁছে যাওয়া মহাকাশযান হিসেবে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে ছুটে চলেছে। পৃথিবী থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করলেও তার ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে কেসরবাই কেরকরের সেই কালজয়ী কণ্ঠ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই সুর আজও মহাকাশের নীরবতার মধ্যে মানবসভ্যতার পরিচয় বহন করে চলেছে।