স্পোর্টস ডেস্ক: ক্রিকেটের মাঠে তাঁর নেতৃত্ব, ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং শৃঙ্খলাবোধ বারবার প্রশংসিত হয়েছে। এ বার ক্রিকেটের বাইরেও নতুন প্রজন্মকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। জেন জি, জেন আলফা এবং মিলেনিয়ালদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, সুস্থ থাকতে গেলে শুধু ভালো খাবার খেলেই হবে না, শরীরচর্চার জন্যও প্রতিদিন সময় বের করতে হবে। আধুনিক জীবনযাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং ফাস্ট ফুডের প্রতি ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। ধোনির সেই বক্তব্যের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি অনুষ্ঠানে লেখক ও গীতিকার জাভেদ আখতারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ধোনি। সেখানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, জীবনের নানা সমস্যা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাওয়া নতুন প্রজন্মকে কী পরামর্শ দিতে চান? উত্তরে ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক শারীরিক সুস্থতার উপরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
ধোনি বলেন, ‘আমি ওদের একটা পরামর্শ দিতে চাই। আমার মনে হয়, বিষয়টা নিজেদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। ভারতের খাদ্যাভ্যাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, অঞ্চলভেদে পার্থক্য থাকলেও আমাদের খাবারে এখনও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি। এর একটা কারণ ছিল। আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক পরিশ্রম অনেক বেশি ছিল। এখন সেই একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস নতুন প্রজন্মের মধ্যেও চলে এসেছে, কিন্তু শারীরিক পরিশ্রম অনেকটাই কমে গিয়েছে।’
কেন বর্তমান প্রজন্মের জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন ধোনি? তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, যাতায়াতের জন্য সহজেই গাড়ি কিংবা অটো পাওয়া যায়। ফলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চেপে অফিসে পৌঁছনো, সারা দিন চেয়ারে বসে কাজ করা এবং আবার গাড়িতে চেপে বাড়ি ফিরে আসা—এই রুটিনেই আটকে পড়ছেন অনেকে। দৈনন্দিন জীবনে হাঁটাচলা ও শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
ধোনির কথায়, ‘আপনি বাড়ি থেকে বেরোলেই অটো কিংবা গাড়ি পেয়ে যাবেন। ফলে গাড়িতে চেপে কাজে যাচ্ছেন, সেখানে বসে কাজ করছেন, তার পরে আবার গাড়িতে চেপে বাড়ি ফিরছেন। এ ভাবে শারীরিক পরিশ্রম অনেকটাই কমে গিয়েছে।’
শুধু শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা নয়, খাবারের অভ্যাস নিয়েও সতর্ক করেছেন ধোনি। তাঁর মতে, তিনি যখন বড় হয়েছেন, তখন ভারতে ফাস্ট ফুডের সংস্কৃতি সবে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। এখন সেই প্রবণতা অনেক বেশি বেড়েছে। নিয়মিত শরীরচর্চা না করে ভাজাভুজি এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খেলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উপর পড়তে পারে।
ধোনি বলেন, ‘আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন ভারতে ফাস্ট ফুডের সংস্কৃতি সবে শুরু হয়েছিল। এখন তা শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছে। চিনিযুক্ত খাবার এবং ভাজাভুজি স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়, বিশেষ করে আপনি যদি শারীরিক ভাবে সক্রিয় না থাকেন।’
নতুন প্রজন্মকে স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রত্যেকের পেশাদার ক্রীড়াবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিয়মিত খেলাধুলো করলে শরীর সুস্থ রাখার পাশাপাশি জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ সামলানোর অভ্যাসও তৈরি হয়। কারও মধ্যে বিশেষ প্রতিভা থাকলে, ছোটবেলা থেকেই তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা উচিত।
ধোনির বক্তব্য, ‘আমি চাইব, ওরা স্কুলের প্রতিটি খেলাধুলোয় অংশ নিক। কারও মধ্যে প্রতিভা থাকলে, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুক। ৩০ কিংবা ৩৫ বছর বয়সে পৌঁছে ওরা বুঝতে পারবে, জীবনের মাঝবয়সে এই অভ্যাস কতটা কাজে এসেছে।’
তবে ধোনির পরামর্শের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হল, প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নিজের শরীরের জন্য বরাদ্দ রাখা। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, জীবনে অর্থ উপার্জন, বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে গেলে চলবে না।
ধোনি বলেন, ‘আমরা সবাই বাবা-মায়ের কথা ভাবি। টাকা উপার্জন করতে হয়, তাঁদের দেখাশোনা করতে হয়। তার পরে সন্তানদের জন্য উপার্জন করতে হয়। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, আপনি নিজের ছেলে-মেয়ের সঙ্গে খেলতে পারবেন কি না। তার জন্য শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকা প্রয়োজন।’
এর পরেই তাঁর সংযোজন, ‘আমি যদি শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকি, তা হলে জীবনেও খুশি থাকতে পারব। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হল, নিজেদের উপর বিনিয়োগ করো। প্রতিদিন এক ঘণ্টা শরীরচর্চার জন্য সময় বের করতে পারলে এবং তার সঙ্গে সাধারণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে পারলে দারুণ হবে।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ২০২০ সালের ১৫ অগস্ট অবসর ঘোষণা করেছিলেন ধোনি। তবে ক্রিকেটের বাইরে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনও অটুট। এ বার তাঁর বার্তা, সুস্থ জীবনযাপন কোনও বিলাসিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।




