মুম্বই: চারদিকে জল। অথচ খাওয়ার জলেই টান। এক দিকে আরব সাগরের বিপুল জলরাশি, অন্য দিকে বাড়তে থাকা মুম্বইয়ের তৃষ্ণা। বর্ষা একটু এ দিক-ও দিক হলেই জলাধারে টান, শহরে জলকাট। এই চিরাচরিত সমস্যার মোকাবিলায় এ বার তাই সমুদ্রকেই জলাধার বানানোর পথে হাঁটছে মুম্বই।
সমুদ্রের নোনা জল শোধন করে পানীয় জলে পরিণত করতে প্রায় ৪,০০৭ কোটি টাকা খরচে মানোরিতে তৈরি হতে চলেছে ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট। পুরো ক্ষমতায় চালু হলে প্রতিদিন ৪০০ মিলিয়ন লিটার পর্যন্ত জল উৎপাদনের লক্ষ্য।
প্রতিদিন ৫৬৪ মিলিয়ন লিটারের ঘাটতি মুম্বইয়ের জল-সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় হিসাবেই। শহরের সাতটি হ্রদ ও জলাধার থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪১০০ মিলিয়ন লিটার জল সরবরাহ করা হয়। কিন্তু নাগরিকদের প্রয়োজন প্রায় ৪৬৬৪ মিলিয়ন লিটার।
অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৬৪ মিলিয়ন লিটার জলের ঘাটতি। এই ব্যবধানই প্রশাসনকে বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। কারণ শহরের জনসংখ্যা এবং জলের ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, তাতে শুধুমাত্র প্রচলিত জলাধারগুলির উপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের চাহিদা মেটানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৃষ্টির উপর নির্ভরতা, আর সেখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মুম্বইয়ের জল-সরবরাহের বড় অংশ নির্ভর করে বর্ষার উপর। বৃষ্টি ভাল হলে জলাধার ভরে যায়, পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক থাকে। কিন্তু বর্ষা মুখ ফিরিয়ে নিলেই শুরু হয় উৎকণ্ঠা।
চলতি বছরও এক সময়ে শহরের জলাধারগুলিতে মজুত নেমে গিয়েছিল বার্ষিক প্রয়োজনের মাত্র ২৩.৫ শতাংশে। পরিস্থিতি সামলাতে বিএমসিকে ১০ শতাংশ জলকাট করতে হয়েছিল। পরে বৃষ্টিতে জলাধারের পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিন্তু সেই ঘটনাই ফের মনে করিয়ে দিয়েছে—মুম্বইয়ের জল-নিরাপত্তা এখনও কতটা বর্ষানির্ভর।
২০০৯-এর জলসঙ্কটের পর ভাবনা, এত দিনে বাস্তবায়ন
সমুদ্রের জল শোধনের ভাবনা অবশ্য আচমকা নয়। ২০০৯ সালের তীব্র জলসঙ্কটের পরই মুম্বইয়ে ডেসালিনেশন প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বিপুল খরচ—সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সময় লেগেছে দীর্ঘ সময়। অবশেষে মানোরিতে সেই পরিকল্পনাই বাস্তব রূপ পেতে চলেছে।
১২ একর জমিতে ‘সমুদ্রের জল কারখানা’ মালাডের কাছে মানোরিতে প্রায় ১২ একর জমির উপর তৈরি হবে প্রকল্পটি। প্রথম পর্যায়ে প্রতিদিন ২০০ মিলিয়ন লিটার জল শোধনের ব্যবস্থা থাকবে। পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষমতা বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়ন লিটার করা হবে।
প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দায়িত্বে রয়েছে ইজরায়েলের IDE Technologies। ২০ বছর প্ল্যান্ট পরিচালনার দায়িত্বও তাদের হাতে থাকবে। নাগরিক পরিকাঠামোর কাজ করবে GVPR Engineers।
নোনা জল থেকে মিষ্টি জল—কী ভাবে?
প্রথমে সমুদ্র থেকে জল তুলে নেওয়া হবে। সেই জলের মধ্যে থাকা বালি, শৈবাল এবং অন্যান্য বড় অশুদ্ধি বাদ দেওয়া হবে প্রাথমিক পরিশোধনের মাধ্যমে।
তার পর আসবে মূল প্রযুক্তি—রিভার্স অসমোসিস। উচ্চচাপে জলকে বিশেষ অর্ধভেদ্য ঝিল্লির মধ্য দিয়ে পাঠানো হবে। জল অণু সেই ঝিল্লি পেরিয়ে যেতে পারলেও লবণ এবং অধিকাংশ দ্রবীভূত অশুদ্ধি আটকে যাবে।
এর পরে প্রয়োজনীয় খনিজের ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে জলকে পানীয় জলের উপযোগী করা হবে। অর্থাৎ যে সমুদ্রের জল সরাসরি পান করা অসম্ভব, প্রযুক্তির কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে সেটিই হয়ে উঠবে শহরের কলের জল।
তবে সমুদ্রকে ‘ডাস্টবিন’ বানানোর ভয়ও আছে ডেসালিনেশনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশের বড় প্রশ্ন। কারণ নোনা জল থেকে মিষ্টি জল বার করার পরে যে অত্যন্ত ঘন লবণাক্ত জল অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় brine।
এই brine সমুদ্রে ফেরানোর ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে সামুদ্রিক পরিবেশের উপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই প্রকল্পে brine নিষ্কাশন, সমুদ্রের নীচ দিয়ে পাইপলাইন এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৪০০ মিলিয়ন লিটারেও মিটবে না পুরো ঘাটতি তবে সমুদ্র থেকে জল আনা শুরু হলেই মুম্বইয়ের জল-সমস্যার পুরো সমাধান হয়ে যাবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই।
শহরের দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ৪৬৬৪ মিলিয়ন লিটার। সেখানে প্রকল্পটির সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ৪০০ মিলিয়ন লিটার। অর্থাৎ নতুন প্রকল্প চালু হলেও প্রচলিত জলাধার ও অন্যান্য উৎসের প্রয়োজন থাকবেই। বরং এই প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে জল-নিরাপত্তার অতিরিক্ত একটি স্তর হিসেবে—বর্ষা কম হলে যাতে শহরকে হঠাৎ করে জলকাটের মুখে পড়তে না হয়।
আজ আরব সাগর, কাল কি অন্য শহরও?
ভারতের উপকূলবর্তী বড় শহরগুলির সামনে জলসঙ্কট যত বাড়বে, ডেসালিনেশন প্রযুক্তির গুরুত্বও তত বাড়তে পারে। বিশেষত এমন শহর, যেখানে এক দিকে সমুদ্রের জল সহজলভ্য, অন্য দিকে মিঠে জলের উৎস সীমিত।
তবে প্রযুক্তির সঙ্গে রয়েছে খরচ ও পরিবেশের প্রশ্ন। বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন, পরিশোধন পরিকাঠামোর ব্যয় রয়েছে, আবার brine নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থাও জরুরি। তাই সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে বদলানো জাদুর সমাধান নয়।
জলাধারের শহর থেকে সমুদ্রের শহর
মুম্বই এত দিন বর্ষার অপেক্ষায় থাকত। আকাশ ভরা মেঘ মানেই জলাধারে স্বস্তি, বৃষ্টি কম মানেই জলকাটের আশঙ্কা। সেই নির্ভরতা কিছুটা কাটাতেই এ বার নজর ঘুরেছে আরব সাগরের দিকে।
প্রকল্প সফল হলে মুম্বইয়ের জল-মানচিত্রে নিঃসন্দেহে বদল আসবে। এত দিন যে সমুদ্র শহরকে ঘিরে রেখেছে, এ বার সেই সমুদ্রের জলই হয়তো শহরের তৃষ্ণা মেটানোর অন্যতম উৎস হয়ে উঠবে। কিন্তু তার সঙ্গে জুড়ে থাকবে আরও বড় প্রশ্ন—সমুদ্র থেকে জল তুলে শহরকে বাঁচাতে গিয়ে সমুদ্রের পরিবেশকে কতটা নিরাপদ রাখা যাচ্ছে?




