নিয়ান্ডারথালরা পূর্বে যতটা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বলে মনে করা হতো, বাস্তবে তারা তার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তাদের উন্নত কাঠের কাজের দক্ষতার প্রমাণ মিলেছে, যা প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
নিয়ান্ডারথালরা কয়েক লক্ষ বছর ধরে ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছিল। প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কয়েক দশক ধরে তাদের আধুনিক মানুষের আদিম ও অনুন্নত আত্মীয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একের পর এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সেই ধারণাকে ক্রমশ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গবেষকেরা এমন প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায়, নিয়ান্ডারথালরা খুব যত্ন করে কাঠ বেছে নিত, পাথরের তৈরি হাতিয়ার দিয়ে কাঠের আকার পরিবর্তন করত এবং বিভিন্ন ধরনের বস্তু তৈরি করত। এই কাজগুলির জন্য প্রয়োজন হতো আগাম পরিকল্পনা, নিখুঁত দক্ষতা এবং বিভিন্ন উপাদানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা।হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন, কারণ কাঠ খুব দ্রুত পচে যায়। ফলে নিয়ান্ডারথালদের ব্যবহৃত বহু প্রযুক্তির নিদর্শন সম্ভবত সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে তাই মূলত পাথরের হাতিয়ার ও হাড়ের মতো উপাদানই বেশি পৌঁছেছে।
জার্মানির শোনিনগেন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে পাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল প্রায় ৩ লক্ষ বছর পুরনো কাঠের তৈরি শিকারের বর্শা। যদিও এই অস্ত্রগুলি যে নিশ্চিতভাবে নিয়ান্ডারথালদের তৈরি, তার অকাট্য প্রমাণ নেই, তবুও ইউরোপে আধুনিক মানুষের ব্যাপক বিস্তারের বহু আগেই প্রাচীন মানুষেরা কাঠের কাজে যথেষ্ট উন্নত দক্ষতা অর্জন করেছিল। অন্যান্য আবিষ্কার থেকেও জানা যায়, নিয়ান্ডারথালরা বার্চ গাছের ছাল থেকে আঠা তৈরি করত, শিকারের সরঞ্জাম বানাত, পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করত এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে আগুন ব্যবহার করত।
এই ধরনের কাজের জন্য বিভিন্ন উপাদানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞান, পারস্পরিক সমন্বয় এবং একাধিক ধাপে কাজ সম্পন্ন করার আগাম পরিকল্পনা করার ক্ষমতা প্রয়োজন হতো। তবে তাদের কাঠের কাজের দক্ষতা আধুনিক মানুষের দক্ষতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন ছিল, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। বর্তমানে টিকে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে এতটা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। ক্রমবর্ধমান প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিয়ান্ডারথালরা ছিল দক্ষ, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম এক আদিম মানবগোষ্ঠী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণা বদলে দেওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
