কাঠমান্ডু: ছবির বাঁ দিকে কয়েক মাস আগের দৃশ্য। পাহাড়ের ঢালে সবুজের আস্তরণ, নীচে আঁকাবাঁকা রাস্তা, নদীর উপর সেতু। সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে একের পর এক বাড়ি ও পরিকাঠামো। ছবির ডান দিকে সেই একই জায়গা—কিন্তু যেন চিনতেই পারা যাচ্ছে না। সবুজ নেই। রাস্তা নেই। সেতুর চিহ্ন নেই। যেখানে ছিল সীমান্তবন্দর, সেখানে এখন কাদা, পাথর, বরফ আর ধ্বংসস্তূপের স্তর। মাত্র কয়েক ঘণ্টার প্রকৃতির তাণ্ডবে একটি পরিচিত ভূদৃশ্য কী ভাবে বদলে যেতে পারে, নেপাল-চিন সীমান্তের উপগ্রহচিত্রে তারই ভয়াবহ প্রমাণ।
২৬ অগস্ট হিমালয়ের কোলে ভয়ঙ্কর হড়পা বানের পর রসুওয়াগঢ়ী-গিয়েরং সীমান্ত এলাকার ‘আগে’ এবং ‘পরে’র উপগ্রহচিত্র সামনে এসেছে। ছবিগুলি দেখাচ্ছে, বন্যার স্রোত শুধু জল নিয়ে আসেনি—তার সঙ্গে নেমে এসেছে বরফ, বিশাল পাথর, কাদা এবং পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। সেই স্রোতে কার্যত মুছে গিয়েছে নেপাল ও চিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যপথের একটি অংশ।
একই জায়গা, অথচ যেন দুই পৃথিবী!
রসুওয়াগঢ়ী সীমান্তপথ নেপাল-চিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যাতায়াতের দরজা। বিপর্যয়ের আগে সেখানে ছিল রাস্তা, সীমান্তকেন্দ্র, সেতু এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো। উপগ্রহচিত্রে পরিষ্কার দেখা যায় সেই স্বাভাবিক ভূদৃশ্য। বন্যার পরের ছবিটিই যেন সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে।
সীমান্তবন্দরের বড় অংশ কার্যত নিশ্চিহ্ন। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ধূসর-বাদামি ধ্বংসস্তূপ। নদীর গতিপথও বদলে গিয়েছে। যে রাস্তা ধরে মানুষ ও পণ্য যাতায়াত করত, তার অনেকটাই এখন কাদা ও পাথরের নীচে।
উপগ্রহচিত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল—ধ্বংসের সীমা চোখে দেখা এলাকার থেকেও অনেক বেশি। সীমান্ত থেকে নীচের দিকে ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা ধরে বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়েছে ধ্বংসাবশেষ। নদী যেন নিজের পুরনো পথ ছেড়ে নতুন করে পথ কেটে নিয়েছে।
সেতু থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র—কিছুই রেহাই পায়নি
সীমান্তের কিছুটা নীচে ছিল সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকাঠামো। বন্যার আগে উপগ্রহচিত্রে যার অস্তিত্ব স্পষ্ট। পরের ছবিতে সেখানে কাদা ও পাথরের বিস্তীর্ণ স্তর। একই ছবি দেখা গিয়েছে বসতি এলাকার ক্ষেত্রেও। যে উপত্যকায় বাড়িঘর ছিল, সেখানে এখন ধ্বংসস্তূপ। কোথাও কোনও নির্মাণের চিহ্নও প্রায় নেই। যেন বন্যা নয়, পাহাড়ের বুকের উপর দিয়ে ছুটে যাওয়া এক বিশাল বুলডোজার।
প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের পিছনে ছিল হিমবাহ ও পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়া। বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথে বাধা তৈরি করে। তার ফলে জল জমে যায়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে জমে থাকা জল ও ধ্বংসাবশেষ প্রচণ্ড গতিতে নীচের দিকে নেমে আসে।
অর্থাৎ, কয়েক ঘণ্টার যে হড়পা বান নীচের জনপদকে তছনছ করল, তার শুরু হয়েছিল অনেক উঁচুতে—হিমালয়ের ঢালে।
বৃষ্টি ছাড়াই কেন এমন বন্যা?
এই বিপর্যয়ের একটি দিক বিশেষজ্ঞদেরও ভাবাচ্ছে। সাধারণত বর্ষার সময় প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি নদীতে আচমকা জল বাড়ে। কিন্তু এই ঘটনায় শুধু বৃষ্টিকে কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে না।
উপগ্রহচিত্র ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে হিমবাহের একটি বড় অংশ ও তার নীচের পাথুরে স্তর ধসে পড়ার প্রমাণ মিলেছে। সেই ধস নদীর জলপ্রবাহে সাময়িক বাধা তৈরি করতে পারে। পরে বাধা ভেঙে গেলে একসঙ্গে বিপুল জল ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে নদীর তীরে থাকা মানুষের কাছে কার্যত কোনও আগাম সতর্কবার্তার সুযোগ ছিল না। জল বাড়তে শুরু করার পর যে গতিতে স্রোত নেমে এসেছে, তাতে কয়েক মিনিটের মধ্যে গোটা এলাকা বদলে যায়।
‘আগে’ ছবিতে ছিল জীবন, ‘পরে’ ছবিতে শুধু ধ্বংস
এই উপগ্রহচিত্রের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিকটি হয়তো এখানেই। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে—মানুষের তৈরি একটি গোটা ব্যবস্থা। রাস্তা আছে। সেতু আছে। সীমান্তকেন্দ্র আছে। বিদ্যুৎ প্রকল্প আছে। নদী নিজের পরিচিত পথ ধরে বয়ে যাচ্ছে। অন্য ছবিতে—সব কিছু যেন মুছে দেওয়া হয়েছে। কেবল নদী এবং পাহাড়ের রেখাগুলি দেখে বোঝা যায়, এটি একই জায়গা। মানুষের কয়েক বছরের নির্মাণ, প্রকৃতির কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে প্রায় অদৃশ্য।
শুধু নেপাল নয়, ধাক্কা চিন-নেপাল বাণিজ্যেও
রসুওয়াগঢ়ী-গিয়েরং পথ দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। সীমান্তের এই পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই দেশের পণ্য পরিবহণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা এসেছে। বিপর্যয়ের ফলে সীমান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থাৎ, বন্যা শুধু কয়েকটি গ্রাম বা নদীর পাড়ের বসতিকে আঘাত করেনি। তার অভিঘাত পৌঁছেছে দুই দেশের সীমান্ত-বাণিজ্যেও।
বিপদ কি এখনও কাটেনি?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। হড়পা বানের ধাক্কায় পাহাড়ি নদীর গতিপথে নতুন করে জল জমে বাধা-হ্রদ তৈরি হয়েছে। উপগ্রহচিত্রে ২৪ থেকে ২৭ অগস্টের মধ্যে ওই এলাকায় জলের পরিমাণ বাড়ার চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পিছনে জল জমেছে। এই ধরনের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে ফের ভয়াবহ জলস্রোত নীচের দিকে নেমে আসতে পারে।
তবে শনিবার চিনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই জলাধারটির জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক ভাবে বাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। উপগ্রহ পর্যবেক্ষণে জলাধারের আয়তনও কমার ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু হিমবাহের গোড়ায় আরও একটি বড় জলাধার রয়েছে কি না, সেটি নিয়ে উদ্বেগ এখনও রয়েছে। অর্থাৎ, প্রথম ঢেউ কেটে গেলেও পাহাড় এখনও পুরোপুরি শান্ত নয়।
উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়ল জলবায়ু-সঙ্কটের আর এক মুখ
বিশেষজ্ঞরা সরাসরি এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছননি। তবে উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ, বরফ এবং উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের মাটি-পাথরের স্থিতিশীলতা বদলাচ্ছে—এমন উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য এলাকায় তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলার ধরন বদলাতে পারে। একই সঙ্গে বরফের নীচের পাথুরে স্তরের স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত হতে পারে। ফলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার মতো বিপদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই কারণেই রসুওয়াগঢ়ীর উপগ্রহচিত্র শুধু একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার ছবি নয়। এটি হিমালয়ের দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশেরও একটি সতর্কবার্তা।
এক সপ্তাহ আগেও যেখানে ছিল সীমান্তের ব্যস্ত রাস্তা, আজ সেখানে কাদা। যেখানে ছিল সেতু, সেখানে বয়ে যাচ্ছে নদী। যেখানে ছিল মানুষের ঘর, সেখানে জমে আছে পাথর। উপগ্রহের চোখে ধরা পড়া ‘আগে’ আর ‘পরে’র দুই ছবি তাই শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই ছুড়ে দেয়, হিমালয় কি শুধু পাহাড়ের চেহারাই বদলাচ্ছে, নাকি বদলে দিচ্ছে তার নীচে বসবাস করা মানুষের নিরাপত্তার সংজ্ঞাও?