চেন্নাই: কয়েক মুহূর্ত আগেও সব স্বাভাবিক ছিল। পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগোচ্ছিল তিনটি বাস। তীর্থযাত্রীরা কেউ গল্প করছিলেন, কেউ জানলার বাইরে তাকিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখছিলেন। আচমকাই বদলে গেল দৃশ্যপট। পাহাড়ের উপর থেকে প্রবল জল, কাদা আর পাথরের স্রোত নেমে এল তীব্র গতিতে। চোখের সামনে ভেসে গেল দু’টি বাস। বাঁচার জন্য তখন গাড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়ে উঁচু পাহাড়ের দিকে ছুটলেন যাত্রীরা। কয়েক মিনিটের সেই লড়াই তাঁদের কাছে যেন কয়েক ঘণ্টার সমান। নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান থেকে প্রাণে বেঁচে তামিলনাড়ু ফিরেছেন ২১ জন তীর্থযাত্রী। শুক্রবার চেন্নাই বিমানবন্দরে নামার পর তাঁদের মুখে একটাই কথা—‘‘এটা যেন দ্বিতীয় জন্ম।’’
কাইলাস-মানস সরোবর যাত্রায় বেরিয়েছিলেন তাঁরা। মোট ৬০ জনের একটি দল তিনটি বাসে করে এগোচ্ছিল। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে আচমকাই ভয়াবহ বিপর্যয়। প্রবল স্রোতে কাদা, পাথর, গাছের গুঁড়ি—সব কিছু মিশে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। সেই স্রোতে ভেসে যায় কনভয়ের দু’টি বাস। তৃতীয় বাসের যাত্রীরা কোনও মতে বেরিয়ে পাহাড়ের উঁচু জায়গায় উঠে প্রাণে বাঁচেন।
বেঁচে ফেরা তীর্থযাত্রীদের এক জন বিজয়ভুবনেশ্বরী এখনও সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে শিউরে উঠছেন। তাঁর কথায়, বিপর্যয় এত দ্রুত এসেছিল যে কী হচ্ছে, তা বোঝার সময়ই পাননি তাঁরা। প্রথমে প্রচণ্ড শব্দ। তার পরেই চারপাশে জল-কাদা-পাথরের তাণ্ডব। যাত্রীরা বুঝে যান, বাসে বসে থাকলে আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। প্রাণের তাগিদে বাস থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করেন তাঁরা।
‘‘আমরা বাস থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পাহাড়ে উঠতে শুরু করি। তখন শুধু মনে হচ্ছিল, কোনও ভাবে উঁচু জায়গায় পৌঁছতে হবে,’’—বেঁচে ফিরে এমনই জানিয়েছেন এক যাত্রী।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্রোতের তীব্রতা এতটাই ছিল যে সামনে থাকা যানবাহনগুলিও কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়। তিমুরে একটি গোটা বাজার এলাকা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জলের তোড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখেছেন তাঁরা। যাত্রীরা জানিয়েছেন, চোখের সামনে দোকান, রাস্তা, গাড়ি—সব কিছু জলের সঙ্গে মিশে যেতে দেখে তাঁদের মনে হয়েছিল, আর হয়তো দেশে ফেরা হবে না।
উঁচু জায়গায় উঠে কোনও মতে নিজেদের নিরাপদ রাখেন ২১ জন। পরে উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় কাঠমান্ডুতে। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে শুক্রবার চেন্নাই পৌঁছন তাঁরা। বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান তামিলনাড়ুর মন্ত্রীরা। দীর্ঘ আতঙ্কের পর পরিবারের লোকজনকে সামনে পেয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দিল্লিতে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও। উদ্ধার হয়ে আসা তীর্থযাত্রীদের মুখে সরাসরি শোনেন নেপালের বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা। তাঁদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত নেপাল সরকার এবং নেপাল সেনাকেও ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
তবে ২১ জনের ঘরে ফেরার আনন্দের মধ্যেও পুরোপুরি কাটেনি উদ্বেগ। তামিলনাড়ু সরকারের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্য থেকে বহু মানুষ নেপালে গিয়েছিলেন। তাঁদের একটি অংশ এখনও নেপালে আটকে রয়েছেন বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। উদ্ধারকাজ চলছে জোরকদমে।
এক দিকে পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব, অন্য দিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ২১ জনের কাহিনি—নেপালের এই বিপর্যয় তাঁদের তীর্থযাত্রার স্মৃতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ঈশ্বরের দর্শনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁরা। মাঝপথে দাঁড়িয়ে দেখেছেন প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপ। বাসের জানলা থেকে পাহাড় দেখার বদলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁদের ছুটতে হয়েছে পাহাড়ের দিকেই—প্রাণ বাঁচানোর শেষ আশায়।
চেন্নাই বিমানবন্দরের বাইরে পরিবারের কাছে ফিরে যখন দাঁড়ালেন তাঁরা, তখন তীর্থযাত্রার কথা নয়, বার বার ফিরে আসছিল সেই কয়েক মিনিটের স্মৃতি। জল, কাদা, পাথর, ভেসে যাওয়া বাস—আর তার মধ্যেই বেঁচে থাকার মরিয়া দৌড়। তাঁদের কাছে নেপাল-যাত্রা তাই আর শুধু তীর্থযাত্রা নয়; মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য কাহিনি।