বিশেষ প্রতিবেদন: ইন্টেলে ২৯ বছরের অভিজ্ঞতা। তার পর দেশের বিনিয়োগ টানার দায়িত্বে ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার শীর্ষ পদে বসেছিলেন নীবৃতি রাই। কিন্তু তিন বছরের মেয়াদ শেষে তাঁর দায়িত্ব বাড়ল মাত্র ছ’মাসের জন্য। আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আপাতত সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও পদে থাকবেন তিনি। কেন নিয়মিত মেয়াদবৃদ্ধির বদলে এই স্বল্পমেয়াদি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা? নেপথ্যে রয়েছে একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অডিটর, অভ্যন্তরীণ কমিটি এবং বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের আধিকারিকদের প্রশ্ন।
২০২৩ সালের ১৯ জুলাই নীবৃতিকে ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার এমডি ও সিইও পদে নিয়োগের কথা ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। তার আগে ২৯ বছর ইন্টেলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ইন্টেল ইন্ডিয়ার কান্ট্রি হেড হিসাবেও সাত বছর দায়িত্ব সামলেছেন। প্রযুক্তি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তাঁকে তিন বছরের মেয়াদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আপাতত ছ’মাসের জন্যই দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি সূত্রের খবর, ২০ জুলাই এই অন্তর্বর্তী মেয়াদবৃদ্ধি কার্যকর হয়। তার আগে টানা ১০ দিন অফিসে যাননি নীবৃতি। পরের দিন কাজে যোগ দেন তিনি।
নীবৃতির মেয়াদ নিয়ে এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে মূলত দু’টি বিষয়। প্রথমত, আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা সংস্থা এ টি কার্নিকে ১৪.১৬ কোটি টাকার চুক্তি দেওয়া নিয়ে অনুমোদন সংক্রান্ত বিতর্ক। দ্বিতীয়ত, নীবৃতির পারিশ্রমিকের উপর কর্মীর বদলে পরামর্শদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মে কর কাটা হয়েছিল কেন, তা নিয়ে অডিটরের আপত্তি।
১৪.১৬ কোটির চুক্তি, অনুমোদন কোথায়?
নীবৃতির প্রথম মেয়াদে ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য এ টি কার্নিকে চার মাসের একটি পরামর্শদাতা চুক্তি দেওয়া হয়েছিল। চুক্তির মূল্য ছিল ১৪.১৬ কোটি টাকা। কিন্তু ওই নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
সংস্থার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার বোর্ডকে জানানো হয়েছিল যে, ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীন আর্থিক তদারকি কমিটি বা ফিনান্সিয়াল ওভারসাইট কমিটি ওই নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণীতে সেই অনুমোদনের উল্লেখ মেলেনি। বরং প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এবং কাজের পরিধি নিয়ে কমিটি প্রশ্ন তুলেছিল। আরও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল।
নীবৃতি অবশ্য দাবি করেছেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া মেনেই এ টি কার্নিকে নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর ই-মেলের মাধ্যমে আর্থিক তদারকি কমিটির অনুমোদন এসেছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরও ছিল। তবে কমিটির প্রশ্নের জবাবে ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার পাঠানো ই-মেলে ওই অনুমোদনের স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না বলে নথিতে দেখা গিয়েছে।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন এ টি কার্নির কাজের মেয়াদ ছ’মাস বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব আসে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত খরচ ছিল ২৬ কোটি টাকা, সঙ্গে কর। ২০২৪ সালের অগস্টে মন্ত্রকের এক অতিরিক্ত সচিবের রিপোর্টে ওই প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কাজের ফলাফল মাপার স্পষ্ট মাপকাঠি নেই কেন, খরচের হিসাব কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের প্রয়োজনীয়তা কী—এমন একাধিক বিষয় উঠে আসে রিপোর্টে।
প্রথম দফায় এ টি কার্নিকে নিয়োগের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের তথ্য দেওয়া হয়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। নীবৃতি জানিয়েছেন, দ্বিতীয় পর্যায়ের চুক্তির অনুমোদন শেষ পর্যন্ত মেলেনি। তবে প্রথম দফার নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রকের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত মনে করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।
নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন
শুধু অনুমোদন নয়, এ টি কার্নিকে বেছে নেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার নথি অনুযায়ী, বিশেষ সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে সংস্থাটিকে নির্বাচন করা হয়েছিল। সেখানে মাত্র তিনটি সংস্থাকে প্রস্তাব জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের মাপকাঠি ছিল অনেকটাই বিষয়নির্ভর। আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে, যে দ্বিতীয় স্তরের তালিকা থেকে সংস্থাগুলিকে ডাকা হয়েছিল, সেই তালিকার চুক্তির দর ২০২২ সালের নভেম্বরেই প্রত্যাহার করে নিয়েছিল ইনভেস্ট ইন্ডিয়া।
ফলে নিয়োগের অনুমোদন, দরপত্রের পদ্ধতি এবং বিপুল অঙ্কের চুক্তির যৌক্তিকতা—তিনটি বিষয়ই পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।
সিইও-র পারিশ্রমিকেও করের গরমিল
নীবৃতির মেয়াদ নিয়ে প্রশ্নের দ্বিতীয় বড় কারণ তাঁর পারিশ্রমিকের কর সংক্রান্ত বিষয়টি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক স্বাধীন অডিটরের রিপোর্টে বলা হয়, নিয়োগের এক বছরেরও বেশি সময় পরেও নীবৃতির পারিশ্রমিকের উপর কর্মীর বদলে পরামর্শদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মে কর কাটা হচ্ছিল। আর্থিক বিবরণীতে প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট করবিধি মেনে চলার সুপারিশ করা হয় ওই রিপোর্টে।
এর পর ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার বোর্ড জানায়, বিষয়টি নজরে আসার পরই সংশোধনমূলক পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং নীবৃতিকে কর্মী হিসাবে পুনরায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। নীবৃতির বক্তব্য, বকেয়া কর ও প্রযোজ্য সুদ তিনি নিজেই মিটিয়েছেন। সংস্থার ভুলের জন্য যে জরিমানা হয়েছিল, তা দিয়েছে ইনভেস্ট ইন্ডিয়া।
তবে নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি পরামর্শদাতা হিসাবে পারিশ্রমিক তোলার ভাউচার জমা দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে নীবৃতির বক্তব্য, সে সময় তাঁকে যে পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল, তিনি সেটাই করেছিলেন। কী ভাবে ওই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তার বিস্তারিত তাঁর মনে নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কী কাজ করে ইনভেস্ট ইন্ডিয়া?
২০০৯ সালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে অলাভজনক সংস্থা হিসাবে ইনভেস্ট ইন্ডিয়া তৈরি হয়। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীন শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রসার দফতর বা ডিপিআইআইটির তত্ত্বাবধানে কাজ করে সংস্থাটি। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ টানা, বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরাই এর মূল লক্ষ্য। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া’ এবং ন্যাশনাল সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেমের মতো কেন্দ্রীয় উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত এই সংস্থা।
নীবৃতির আগে ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার প্রধান ছিলেন দীপক বাগলা। তাঁর মেয়াদ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রকের অডিটে সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণের পর তিনি পদ ছেড়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে নীবৃতির নিয়োগকে সংস্থার নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসাবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর নিজের মেয়াদের শেষ পর্বে একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সংস্থার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
নীবৃতি অবশ্য অভিযোগগুলি মানতে চাননি। এ টি কার্নির চুক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। কর সংক্রান্ত বিষয়টিকে প্রক্রিয়াগত ভুল হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব অবশ্য তিনি দেননি। ডিপিআইআইটির তরফেও এ বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে আপাতত ছ’মাসের অন্তর্বর্তী মেয়াদেই ইনভেস্ট ইন্ডিয়ার শীর্ষ পদে থাকছেন নীবৃতি রাই। এই সময়ের মধ্যে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে পর্যালোচনা কোন দিকে এগোয় এবং জানুয়ারি ২০২৭-এর পর তাঁর দায়িত্ব নিয়ে কেন্দ্র কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন নজর সেদিকেই।




