নয়াদিল্লি: আমেরিকা ছেড়ে দেশে ফিরেছিলেন আপনজনদের আরও কাছে থাকার আশায়। ভেবেছিলেন, এত বছর পর নিজের দেশে ফিরলে হয়তো পুরনো বন্ধুত্ব, পরিবার আর পরিচিত পরিবেশ তাঁকে ফের আপন করে নেবে। কিন্তু দেশে ফেরার 6 মাস পর তাঁর অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্য রকম। পুরনো বন্ধুরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, পরিবারের সঙ্গেও আগের মতো যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না। আর আমেরিকায় কাটানো জীবনের স্বাধীনতা, নিজস্ব রুটিন বার বার মনে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের আক্ষেপ উজাড় করে লিখলেন ওই প্রবাসী ভারতীয়, ‘‘আমার মনে হচ্ছে, আমি আর এখানে belong করি না।’’
বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন
রেডিটে নিজের অভিজ্ঞতা লিখে ওই ব্যক্তি জানান, দীর্ঘ সময় আমেরিকায় থাকার পর প্রায় 6 মাস আগে ভারতে ফিরে এসেছেন। মূল কারণ ছিল বাবা-মায়ের কাছে থাকা এবং তাঁদের দেখভাল করা। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, দেশে ফিরে আসাটাই হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবে ফিরে এসে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইটা যে এত কঠিন হবে, তা তিনি ভাবতে পারেননি।
‘পুরনো বন্ধুরা আর আগের মতো নেই’
দেশে ফেরার পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সামাজিক সম্পর্কের জায়গায়। তাঁর দাবি, এক সময় যাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, তাঁরা এখন প্রত্যেকেই নিজেদের কাজ, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত। দেখা করার জন্য বার বার যোগাযোগ করেও তেমন সাড়া পাচ্ছেন না তিনি।
ওই ব্যক্তির কথায়, ‘‘আমি জানি সবাই ব্যস্ত। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন বদলায়। কিন্তু বার বার চেষ্টা করার পর মনে হয়, বন্ধুত্বটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শুধু আমিই করছি।’’ সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি। যে দেশে ফিরে এসে মানুষের ভিড়ে থাকার কথা, সেখানেই নিজেকে একা মনে হচ্ছে তাঁর।
ভাইয়ের সঙ্গেও বদলেছে সম্পর্ক
শুধু বন্ধুত্ব নয়, পরিবারের মধ্যেও আগের মতো ঘনিষ্ঠতা অনুভব করছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন তাঁকে আরও ভাবিয়েছে। ভেবেছিলেন, দেশে ফিরে পরিবারের কাছাকাছি থাকলে সম্পর্কগুলি আরও গভীর হবে। কিন্তু বাস্তবে তাঁর মনে হয়েছে, এত বছর দূরে থাকার ফলে পরিবারের মানুষগুলির জীবনও বদলে গিয়েছে। ফলে একই বাড়ি বা একই শহরে থেকেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে এই অভিজ্ঞতাই সামনে এসেছে তাঁর লেখায়।
বার বার মনে পড়ছে আমেরিকার জীবন
দেশে ফেরার পরেও তাঁর মন পড়ে রয়েছে আমেরিকার জীবনে। সেখানে তৈরি হয়েছিল নির্দিষ্ট রুটিন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং একটি পরিচিত সামাজিক পরিমণ্ডল। নিজের জীবনের গতিপথ নিয়েও সেখানে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছিল। ভারতে ফিরে সেই পরিচিত ছন্দটাই যেন হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগছে—দেশে ফিরে কি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
তবে একই সঙ্গে বাবা-মায়ের কথা ভেবেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে তাঁদের দায়ী করতেও চান না তিনি। তাঁর বক্তব্য, বাবা-মা তাঁকে কাছে চেয়েছিলেন, তাঁদের উদ্বেগও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে ফিরে আসার পর মানসিক ভাবে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি তাঁর ধারণার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়েছে।
‘6 মাসেই সিদ্ধান্ত নয়’
ওই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর রেডিটে শুরু হয় আলোচনা। অনেকেই তাঁকে আরও সময় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বহু বছর বিদেশে থাকার পর মাত্র 6 মাসের মধ্যে নতুন করে সামাজিক জীবন তৈরি করা সহজ নয়। কেউ তাঁকে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারও মতে, পুরনো সম্পর্ককে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা না করে নতুন বন্ধু, নতুন অভ্যাস এবং নতুন সামাজিক পরিমণ্ডল তৈরি করাই বেশি কার্যকর হতে পারে। আবার কেউ বলেছেন, ভারতের অন্য শহর বা অন্য পরিবেশে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার কথাও ভাবা যায়।
‘রিভার্স কালচার শক’ কি?
রেডিটের এক ব্যবহারকারী তাঁর অভিজ্ঞতাকে ‘reverse culture shock’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, দীর্ঘ সময় অন্য দেশের পরিবেশে থাকার পর নিজের দেশেই ফিরে এসে পরিচিত জায়গাকে নতুন বা অচেনা মনে হওয়া। বিদেশে থাকার সময়ে মানুষের জীবনধারা, কাজের পরিবেশ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক অভ্যাস বদলে যেতে পারে। সেই পরিবর্তন নিয়ে আবার আগের পরিবেশে ফিরে গেলে মানিয়ে নিতে সময় লাগতে পারে। ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সেই অভিজ্ঞতাই ঘটছে বলে কয়েক জন মন্তব্য করেছেন।
দেশ বদলায়, মানুষও বদলায়
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। বিদেশে চলে যাওয়ার পর শুধু যিনি বাইরে যান, তাঁর জীবনই বদলায় না। দেশে থেকে যাওয়া পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত মানুষগুলির জীবনও নিজের গতিতে এগিয়ে যায়। কেউ চাকরি বদলান, কেউ বিয়ে করেন, কেউ অন্য শহরে চলে যান, কেউ আবার নতুন দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে বহু বছর পর ফিরে এসে পুরনো জায়গা, পুরনো মানুষ এবং পুরনো সম্পর্ককে হুবহু আগের অবস্থায় পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। ওই প্রবাসীর অভিজ্ঞতায় সেই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে এসেছে।
‘ফিরে আসা’ মানেই সব আগের মতো নয়
প্রবাসজীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসাকে অনেকেই পরিবারের কাছে ফেরা বা নিজের শিকড়ে ফিরে আসা হিসেবে দেখেন। কিন্তু এই ঘটনা দেখাল, শিকড়ের জায়গাটিও সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। তাই বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত শুধু চাকরি, অর্থনীতি বা পরিবারের বিষয় নয়—সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্নটিও তার সঙ্গে জড়িত।
ওই প্রবাসীর পোস্টের শেষ কথা তাই কোনও সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি প্রশ্ন—যে দেশে জন্ম, বহু বছর পর ফিরে এসে সেই দেশকেই যদি অচেনা মনে হয়, তবে নিজের ‘ঘর’ বলতে ঠিক কোন জায়গাটাকে বোঝাবে মানুষ? এক জনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সমস্ত প্রবাসী বা দেশে ফেরা মানুষের পরিস্থিতি বিচার করা যায় না। কিন্তু তাঁর 6 মাসের অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় সামনে এনেছে দেশে ফেরার বিমানযাত্রা কয়েক ঘণ্টার, কিন্তু পুরনো জীবনে ফিরে যাওয়ার পথটি অনেক দীর্ঘ।