কলকাতা: একটি ফুলের নকশা। সেই নকশা থেকেই তৈরি হয়েছিল বাংলার রাজনীতির অন্যতম পরিচিত নির্বাচনী প্রতীক—ঘাসের উপর জোড়া ফুল। প্রায় 28 বছর পর সেই প্রতীকের নেপথ্যে নিজের ভূমিকার দাবি তুলে নতুন বিতর্ক উস্কে দিলেন শিল্পী সোমনাথ চৌধুরী। তাঁর দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের সময় তৎকালীন কংগ্রেস নেতা অজিত পাঁজার অনুরোধে তিনিই একাধিক ফুলের নকশা এঁকেছিলেন। সেই নকশাগুলির মধ্য থেকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল জোড়াফুলের প্রতীক। এত বছর পরেও সেই কাজের স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপও জানিয়েছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি তৃণমূলের পুরনো নাম ও ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক অন্তর্বর্তী ভাবে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর সোমনাথের বক্তব্য, এত দিন পরে অন্তত তাঁর আঁকা প্রতীকের ইতিহাস নিয়ে কথা হচ্ছে। তাঁর দাবি, কমিশনের সিদ্ধান্তে তিনি ‘সঠিক বিচার’-এর আশা দেখছেন।
তবে শিল্পীর এই দাবি সরাসরি মানতে নারাজ তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, কোনও শিল্পী যদি প্রাথমিক নকশা এঁকে থাকেনও, তার অর্থ এই নয় যে প্রতীকের মূল ভাবনাটিও তাঁর। কুণালের দাবি, ‘জোড়া ঘাসফুল’-এর পিছনে রাজনৈতিক ভাবনা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ফলে প্রায় তিন দশক পরে কোনও শিল্পীর পক্ষ থেকে প্রতীকের কৃতিত্ব দাবি করাকে তিনি প্রচার পাওয়ার চেষ্টা হিসাবেই দেখছেন।
সোমনাথের বর্ণনা অনুযায়ী, 1998 সালের গোড়ায়, তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের আগে অজিত পাঁজা তাঁকে কয়েকটি ফুলের নকশা তৈরি করে দিতে বলেছিলেন। সেই নির্দেশ মেনেই তিনি একাধিক স্কেচ তৈরি করেন। পরে টেলিভিশনে নতুন দলের প্রতীক প্রকাশের সময় তিনি দেখতে পান, তাঁর আঁকা নকশার সঙ্গে মিল থাকা জোড়া ফুলই প্রতীক হিসেবে সামনে এসেছে। কিন্তু তার পরেও দলের তরফে তাঁকে কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা সম্মান দেওয়া হয়নি—এমনটাই তাঁর দাবি।
ঘটনার প্রায় তিন দশক পরে কেন এই দাবি? সোমনাথের বক্তব্য, এত দিন বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেননি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর পুরনো ঘটনাটি ফের সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, প্রতীক তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর সৃজনশীল ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল।
কুণালের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর বক্তব্য, একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক শুধুমাত্র একটি আঁকা ছবির বিষয় নয়। তার সঙ্গে দলের রাজনৈতিক দর্শন ও বার্তার যোগ থাকে। ‘ঘাস’কে মাটির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে বা ‘গ্রাসরুট’-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখার ব্যাখ্যা রয়েছে। আর জোড়া ফুলের মধ্যে সম্প্রীতি এবং নারী-পুরুষের সমতার ভাবনাও প্রতিফলিত হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
কুণালের বক্তব্য, তৃণমূল তৈরির একেবারে গোড়ার দিকে অজিত পাঁজা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর ধারণা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা বা নির্দেশের ভিত্তিতে অজিত পাঁজা একাধিক শিল্পীর কাছ থেকে প্রাথমিক নকশা বা রাফ স্কেচ করিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু সেই স্কেচ আঁকা আর প্রতীকের মূল রাজনৈতিক ভাবনার কৃতিত্ব—দুই বিষয় এক নয়। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর সেটিই।
নিজের অভিজ্ঞতার উদাহরণও দিয়েছেন কুণাল। তাঁর দাবি, তৃণমূলের প্রথম দিকের ইস্তাহারের খসড়া তৈরির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। নিজের মতো করে খসড়া লেখার পর সেটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিমার্জন করে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন বলে কুণালের দাবি। সেই উদাহরণ টেনেই তাঁর বক্তব্য, কোনও সৃষ্টির প্রাথমিক খসড়া যিনি তৈরি করেন, চূড়ান্ত রাজনৈতিক ভাবনার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব সব সময় তাঁর হয় না।
কিন্তু বিতর্কের আসল জায়গা অন্যত্র। 1998 সালে ঠিক কী ভাবে প্রতীকটি তৈরি হয়েছিল? কে প্রথম জোড়া ফুলের ধারণা দিয়েছিলেন? অজিত পাঁজা কি কোনও শিল্পীকে নকশা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন? সোমনাথের দাবি করা স্কেচগুলি এখনও কোথাও সংরক্ষিত রয়েছে কি না? সেই সময়কার কোনও চিঠি, নির্দেশ, দলীয় নথি বা সাক্ষীর বক্তব্য পাওয়া যায় কি না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই ইতিহাসের ধোঁয়াশা অনেকটা কাটতে পারে।
আর এই পুরনো বিতর্কের মধ্যেই ‘জোড়াফুল’ নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে বিবাদের জেরে 17 সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ‘All India Trinamool Congress’ নাম এবং ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা দেয়। কমিশন দুই পক্ষকেই নতুন নাম ও প্রতীকের বিকল্প দিতে বলে।
পরের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘Mamata All India Trinamool Congress’ নাম এবং ‘Football Player’ প্রতীক দেওয়া হয়। অন্য গোষ্ঠীকে দেওয়া হয় ‘Democratic Trinamool Congress’ নাম এবং ‘Envelope’ প্রতীক। কমিশনের এই ব্যবস্থা আপাতত সংশ্লিষ্ট উপনির্বাচনগুলির জন্য অন্তর্বর্তী।
ফলে 28 বছর ধরে দলের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই জোড়া ফুল এখন শুধু একটি প্রতীক নয়, তার ইতিহাস নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিল্পী বলছেন, ‘নকশা আমার’। তৃণমূলের পাল্টা বক্তব্য, ‘নকশা থাকলেও মূল ভাবনা অন্যের’। দুই দাবির মাঝখানে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে 1998 সালের সেই সময়কার নথি। কাগজপত্র বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ সামনে না আসা পর্যন্ত জোড়াফুলের নেপথ্যের এই কৃতিত্বের বিতর্ক তাই দাবিতেই আটকে থাকছে।