নয়াদিল্লি: একটি লাল টি-শার্ট, তার বুকে হলুদ-কমলা খড়ের টুপি পরা হাসিমুখের খুলি। দেখতে সাধারণ অ্যানিমে বা কমিকসের প্রতীক মনে হলেও, দিল্লির রাজপথে আন্দোলনের মাঝে এই লোগোই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরার পরনে থাকা টি-শার্ট ঘিরে শুরু হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে চর্চা। প্রশ্ন উঠছে, জনপ্রিয় জাপানি মাঙ্গা ‘ওয়ান পিস’-এর এই প্রতীকের সঙ্গে প্রতিবাদের কী সম্পর্ক? কেনই বা তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে উঠছে বিদ্রোহের পরিচয়?
১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালীন নেহার একটি ছবি ক্যামেরাবন্দি হয়। পরে সেই ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই নজরে আসে তাঁর টি-শার্টের লোগো। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়া নেহার পোশাকের এই প্রতীক নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। অনেকের মতে, এটি নিছক পছন্দের পোশাক নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তরুণদের প্রতিবাদী মানসিকতার একটি সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
https://x.com/TheFederal_News/status/2109996459420700810?s=20
কী এই ‘ওয়ান পিস’-এর প্রতীক?
১৯৯৭ সালে জাপানি লেখক ও চিত্রশিল্পী এইচিরো ওদার হাত ধরে শুরু হয় জনপ্রিয় মাঙ্গা সিরিজ ‘ওয়ান পিস’। এর প্রধান চরিত্র মাঙ্কি ডি. লুফি এবং তার জলদস্যু দল স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব ও নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য নানা বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করে। গল্পে দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং অন্যায়ের মোকাবিলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই সিরিজের পরিচিত প্রতীক ‘স্ট্র হ্যাট পাইরেটস’-এর খুলি ও খড়ের টুপি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যানিমে ও মাঙ্গার অনুরাগীদের কাছে এটি পরিচিত সাংস্কৃতিক চিহ্ন হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন দেশের তরুণদের আন্দোলনেও এই প্রতীক দেখা গিয়েছে। আন্দোলনকারীদের একাংশের কাছে এটি প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, স্বাধীনতার দাবি এবং অন্যায়ের প্রতিবাদের বার্তা বহন করে।
নেপাল থেকে ফ্রান্স, ছড়িয়েছে প্রতিবাদের ভাষা
২০২৫ সালে নেপালে তরুণদের আন্দোলনের সময়ও ‘ওয়ান পিস’-এর এই প্রতীক নজরে এসেছিল। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন আন্দোলনেও এই লোগোর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশভেদে আন্দোলনের দাবি আলাদা হলেও, এই প্রতীকের ব্যবহার তরুণদের মধ্যে এক ধরনের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করেছে।
সমাজমাধ্যমের যুগে কোনও প্রতীক ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না। জনপ্রিয় অ্যানিমে, সিনেমা কিংবা কমিকসের চরিত্রের মাধ্যমে তরুণেরা নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করছেন। ‘ওয়ান পিস’-এর লোগোও সেই প্রবণতার অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
টি-শার্ট ঘিরে কেন বিতর্ক?
নেহার আটকের ছবি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর পোশাকের প্রতীক নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে। আন্দোলনে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা যোগেন্দ্র যাদব এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের মতো ব্যক্তিরাও অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নেহার টি-শার্টের লোগোকে তিনি নিজে সচেতন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
একাংশের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদের ভাষা বদলাচ্ছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, কাল্পনিক গল্পের প্রতীককে বাস্তব রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার সীমা কোথায়।
সব মিলিয়ে, নেহার লাল টি-শার্ট এখন পোশাকের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর আলোচনার বিষয়। জনপ্রিয় সংস্কৃতি, সমাজমাধ্যম এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, ‘ওয়ান পিস’-এর এই প্রতীককে ঘিরে বিতর্ক সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে আনছে।
