গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতার কেন্দ্রে এত দিন ছিলেন নির্বাচিত প্রধান। সরকারি প্রকল্পের বিল, আর্থিক নথি কিংবা উন্নয়নমূলক কাজের চূড়ান্ত অনুমোদনে তাঁর সই ছিল কার্যত শেষ কথা। কিন্তু সেই ছবিতেই বড় বদল আনল রাজ্য সরকার। শনিবার বিধানসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হল পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত (সংশোধনী) বিল। নতুন আইনে গ্রাম প্রধানের আর্থিক নথিতে সইয়ের একচ্ছত্র ক্ষমতা কার্যত খর্ব করা হল। এখন থেকে প্রধান প্রশাসনিক অনুমোদন দিলেও আর্থিক নথিতে সই করবেন পঞ্চায়েতের সচিব বা সহকারী সচিব।
সরকারের যুক্তি, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বহু গ্রাম প্রধান পঞ্চায়েতে অনুপস্থিত। তার জেরে বহু জায়গায় উন্নয়নমূলক কাজ, প্রকল্পের টাকা ছাড়া, শ্রমিকদের মজুরি-সহ একাধিক সরকারি পরিষেবা আটকে যাচ্ছে। সেই অচলাবস্থা কাটাতেই এই সংশোধনী।
বিধানসভায় বিলটি পেশ হওয়ার পর ভোটাভুটির দাবি তোলেন তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ভোটে বিলের পক্ষে সমর্থন দেন ১৬৯ জন বিধায়ক। বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৩টি। ভোটদানে বিরত থাকেন ৩২ জন। ফলে বিপুল ভোটে গৃহীত হয় সংশোধনী বিল।
তবে বিল পাশের থেকেও বেশি রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের জবাবি ভাষণ। বিরোধীদের উদ্দেশে একের পর এক তির ছুড়ে তিনি কার্যত পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় দুর্নীতি, কাটমানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগকে সামনে এনে রাজনৈতিক আক্রমণ শানান।
"অনেকে পঞ্চায়েতের টিকিট কিনেছিলেন, পঞ্চায়েত সমিতির টিকিট কিনেছিলেন, জেলা পরিষদের টিকিট কিনেছিলেন। সেই টাকার হিসাব এখনও মেলেনি। দু'বছরের মাথায় ক্ষমতা চলে যাওয়ায় সেই বিনিয়োগই এখন ডুবে যাচ্ছে,"— কটাক্ষ করেন মন্ত্রী। এর পরই আরও তীব্র ভাষায় তিনি বলেন, “বাংলায় একটা কথা চালু হয়েছে— উপরে ভগবান, আর নিচে প্রধান। এই কারণেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আজ মানুষের কাছে বদনামের প্রতীক। সাধারণ মানুষের ঘর যেমন ছিল, তেমনই আছে। কিন্তু অনেক প্রধানের বাড়ি তিনতলা হয়ে গিয়েছে।”
দিলীপের দাবি, এই সংশোধনী কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটানোর উদ্যোগ। তাঁর কথায়, “একজন প্রধান সই না করলেই গোটা পঞ্চায়েত থেমে থাকবে, এমন ব্যবস্থা চলতে পারে না। প্রধান সিদ্ধান্ত নেবেন, কিন্তু সই করবেন সচিব বা সহকারী সচিব। সরকার মানুষের কাজ চালাতে এসেছে, কোনও ব্যক্তির ইচ্ছার কাছে প্রশাসনকে জিম্মি করতে নয়।”
এর পরই সরাসরি কাটমানি ইস্যু সামনে এনে মন্ত্রী বলেন, "কাটমানি না পেলে অনেক ক্ষেত্রে সইই হয় না। এই বিল সেই সংস্কৃতিতে আঘাত করবে। রাস্তা হবে, টেন্ডার হবে, উন্নয়ন হবে। কিন্তু কাটমানি আদায়ের সুযোগ আর থাকবে না।" বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর আরও মন্তব্য, “আপনাদের কষ্ট প্রধানদের জন্য নয়, তাঁদের হাতে থাকা টাকার উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য। দেশের অন্য কোনও রাজ্যে গ্রাম প্রধানের হাতে এত আর্থিক ক্ষমতা নেই, যতটা পশ্চিমবঙ্গে ছিল।”
অনুপস্থিত প্রধানদেরও একহাত নেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, "সরকারকে অপদস্থ করতেই অনেক প্রধান পঞ্চায়েতে আসছেন না। অনেকেই আমাকে বলেছিলেন পঞ্চায়েত ভেঙে দিতে। কিন্তু সরকার ভাঙতে নয়, গড়তে এসেছে। মানুষের পরিষেবা বন্ধ হতে দেওয়া হবে না।" একই সঙ্গে বিরোধীদের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে দিলীপ স্পষ্ট করে দেন, এটি স্থায়ী পরিবর্তন নয়। তাঁর দাবি, মূল পঞ্চায়েত আইনে কোনও সংশোধন করা হয়নি। “সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়নি। এটি শুধুই অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যাতে সাধারণ মানুষের কাজ বন্ধ না থাকে।”
একশো দিনের কাজ নিয়েও আশাবাদী সুর শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে। "১০০ দিনের প্রকল্পের টাকা আবার আসবে। আমরা চাই সেই টাকা সরাসরি শ্রমিকের হাতে পৌঁছোক। কোনও প্রধানের সইয়ের জন্য গরিব মানুষের প্রাপ্য অর্থ আটকে থাকবে না," বলেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বিল কেবল একটি প্রশাসনিক সংশোধনী নয়, বরং গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতার কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এত দিন নির্বাচিত প্রধানের হাতে যে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত ছিল, তার একটি বড় অংশ এখন প্রশাসনিক আধিকারিকদের হাতে যাচ্ছে। ফলে এই বিল আগামী দিনে শুধু পঞ্চায়েত পরিচালনার ধরনই নয়, গ্রামীণ রাজনীতির ক্ষমতার সমীকরণও নতুন করে লিখতে পারে।