নিউজ ডেস্ক: বর্তমান সময়ে খাদ্যদ্রব্যের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য রয়েছে আধুনিক পরীক্ষাগার, বিশেষ রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং নির্দিষ্ট পরীক্ষাপদ্ধতি। অথচ উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতে খাদ্যপণ্যের গুণগত মান পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই সময় ভারতীয় খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। গবেষণার বিষয় হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন কিছু সাধারণ খাদ্যবস্তু, যেগুলি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের তেল ও চর্বিজাতীয় উপাদান, যার সঙ্গে ঘি ও সর্ষের তেলের বিশুদ্ধতার প্রশ্নও জড়িয়ে ছিল।
ভারতীয় খাদ্যবস্তুকে তিনি শুধু প্রচলিত ধারণা বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নয়, রাসায়নিক পরীক্ষার সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের গবেষণাপত্র On the Chemical Examination of Certain Indian Food Stuffs. Part I, Fats and Oils ১৮৯৪ সালে Journal of the Asiatic Society of Bengal পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গবেষণাপত্রটি পত্রিকাটির ৬৩তম খণ্ডের প্রথম সংখ্যায়, ৫৮ থেকে ৭৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল।
ঔপনিবেশিক বাংলায় ঘি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাদ্যবস্তু। রান্নার পাশাপাশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এর ব্যবহার ছিল। ফলে ঘির বিশুদ্ধতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ শুধু খাদ্যের গুণমানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসও জড়িয়ে ছিল। ঘিতে অন্য চর্বি বা সস্তা উপাদান মেশানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। একইভাবে সর্ষের তেল ছিল বাংলার রান্নাঘরের অপরিহার্য উপাদান। তেলের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ত।
এই প্রাথমিক গবেষণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই। প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন রসায়নবিদ, শিক্ষক এবং ভারতে আধুনিক রাসায়নিক শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৮৯২ সালে তিনি বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কাছে রসায়নচর্চার গুরুত্ব শুধু গবেষণাগারে নতুন জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশীয় শিল্পের বিকাশ, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধানেও বিজ্ঞানের ব্যবহারকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষা ছিল তাঁর এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে রাসায়নিক বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পথ খুলে দেয়। কোনও খাদ্যবস্তু দেখতে স্বাভাবিক হলেই যে তার গঠনও বিশুদ্ধ হবে, এমন নয়। আবার রং, গন্ধ বা ঘনত্বের সামান্য পার্থক্য দেখেই কোনও নমুনাকে ভেজাল বলা যায় না। রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব। প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের গবেষণাকে এই বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়। তবে তাঁর ১৮৯৪ সালের গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত প্রতিটি পরীক্ষাপদ্ধতি এবং কোন ভেজাল শনাক্ত করতে তিনি ঠিক কী ফল পেয়েছিলেন, তা মূল লেখাটি বিশদে যাচাই না করে নির্দিষ্টভাবে বলা উচিত নয়।
কলকাতা পৌর প্রশাসনের ১৯১৮–১৯১৯ সালের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য এই সমস্যার একটি ধারণা দেয়। ওই সময় পরীক্ষিত ১,৪০১টি ঘির নমুনার মধ্যে ১২৯টি এবং ৪৫৪টি সর্ষের তেলের নমুনার মধ্যে ১০৬টি ভেজাল বলে শনাক্ত হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের গবেষণার ফল নয়; এটি তাঁর গবেষণার পরবর্তী সময়ের খাদ্য পরীক্ষার সরকারি হিসাব। তবু সংখ্যাগুলি বুঝিয়ে দেয়, খাদ্যপণ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই কেন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এখানে দেশীয় অর্থনীতির প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা যায় না। প্রফুল্লচন্দ্র রায় দেশীয় শিল্পের বিকাশে গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল আত্মনির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে ঘি বা সর্ষের তেলের বিশুদ্ধতা নিয়ে তাঁর রাসায়নিক গবেষণা এবং দেশীয় ব্যবসার পক্ষে তাঁর অবস্থানকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। এই দুটি বিষয়ের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলেও প্রত্যেকটির প্রমাণ আলাদাভাবে বিচার করা প্রয়োজন।
খাদ্যে ভেজাল নিয়ে সেই সময়ের উদ্বেগ পরবর্তী দশকগুলিতেও অব্যাহত ছিল। ইতিহাসবিদ উৎসা রায় তাঁর Culinary Culture in Colonial India গ্রন্থে ঔপনিবেশিক বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি, খাদ্যের বিশুদ্ধতা এবং খাদ্যবাজার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে, খাদ্যের গুণমান পরীক্ষা এবং ভেজাল নিয়ন্ত্রণ ক্রমে জনস্বাস্থ্য ও পৌর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৩০ বছর আগের এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান শুধু মহাকাশ, পরমাণু বা জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিষয় নয়। রান্নাঘরের তেল, ঘি কিংবা প্রতিদিনের খাবারও বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। খাদ্যের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা, পরীক্ষার মাধ্যমে তার উত্তর খোঁজা এবং সেই জ্ঞানকে জনস্বাস্থ্যের কাজে লাগানো আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিরই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
