ট্রেন ধরতে এসে তেষ্টা পেয়েছে। সামনে রেলের ওয়াটার কুলার। নিশ্চিন্তে বোতল ভরে জল খেলেন। কিন্তু সেই জলই যদি বহন করে রোগজীবাণু? ভারতীয় রেলের স্টেশনগুলিতে যাত্রীদের জন্য সরবরাহ করা পানীয় জলের মান নিয়ে এমনই বিস্ফোরক ছবি সামনে এনেছে নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব পরীক্ষক বা ক্যাগ। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের ওয়াটার কুলার থেকে সংগ্রহ করা জলের নমুনায় মিলেছে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া। কোথাও আবার পানীয় জলের কোনও ব্যাকটেরিয়াজনিত পরীক্ষাই হয়নি। শুধু জল নয়, যাত্রীদের জন্য ন্যূনতম পরিষেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রেলের একাধিক জোনের বিরুদ্ধে গুরুতর গাফিলতির ছবি উঠে এসেছে রিপোর্টে।
১২ অগস্ট সংসদে পেশ করা ‘ভারতীয় রেলের নন-সাবার্বান স্টেশনগুলিতে যাত্রী-সুবিধা ও পরিচ্ছন্নতা’ সংক্রান্ত রিপোর্টে ৫১২টি স্টেশনের পরিষেবা খতিয়ে দেখে এমনই তথ্য জানিয়েছে ক্যাগ। অডিটের আওতায় নেওয়া স্টেশনগুলির প্রায় ৮৯ শতাংশেই ন্যূনতম অত্যাবশ্যকীয় যাত্রী-সুবিধা হয় ছিল না, নয়তো নির্ধারিত মানের তুলনায় অপর্যাপ্ত ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলের নমুনার ফল আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ক্যাগ জানিয়েছে, সাউদার্ন রেলের কোয়েম্বাটোর ও পালক্কড় জংশন, সাউথ সেন্ট্রাল রেলের হায়দরাবাদ, সেন্ট্রাল রেলের ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ টার্মিনাস, ভিওয়ান্ডি রোড, কল্যাণ ও লোনাভালা এবং ইস্টার্ন রেলের মধুপুর স্টেশনের ওয়াটার কুলার থেকে সংগৃহীত জলের নমুনায় ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে।
ই-কোলাই সাধারণত মানুষের অন্ত্রে পাওয়া যায়। পানীয় জলে এর উপস্থিতি জল দূষণের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ ধরনের ই-কোলাই শরীরে ঢুকলে পেটের অসুখ, ডায়রিয়া-সহ নানা শারীরিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। ফলে কোটি কোটি যাত্রী যে জল ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেন, সেখানে এমন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
ক্যাগের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, সমস্যা শুধু ওয়াটার কুলারে আটকে নেই। ২০২২-২৩ সালে আটটি জোনের ৪৯টি স্টেশনে এবং ২০২৩-২৪ সালে ন’টি জোনের ৫৬টি স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের কল থেকে সংগৃহীত পানীয় জলের নমুনায় ‘টোটাল কলিফর্ম’ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গিয়েছে। এই পরীক্ষার মধ্যে ই-কোলাইও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত পরীক্ষাতেও সব জায়গায় সন্তোষজনক ফল মেলেনি। ২০২২-২৩ সালে চারটি জোনের আটটি স্টেশনে এবং ২০২৩-২৪ সালে পাঁচটি জোনের ১১টি স্টেশনে এমন অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে পরীক্ষার ব্যবস্থা নিয়েই। ক্যাগ জানিয়েছে, ছ’টি জোনের ৫৯টি স্টেশনে পানীয় জলের কোনও ব্যাকটেরিয়াজনিত পরীক্ষা করা হয়নি। অর্থাৎ যাত্রীদের যে জল দেওয়া হচ্ছে, সেটি স্বাস্থ্যসম্মত কি না তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাই কোথাও কোথাও হয়নি।
কিন্তু রেলের স্টেশনে যাত্রী-সুবিধার ক্ষেত্রে তো নিয়ম রয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলেই রেলওয়ে বোর্ড NSG-1 থেকে NSG-6 পর্যন্ত শ্রেণিবদ্ধ স্টেশনের জন্য ন্যূনতম, প্রস্তাবিত এবং কাঙ্ক্ষিত পরিষেবার তালিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। নির্দেশ ছিল, ২০১৮ সালের ৩১ অগস্টের মধ্যে সব স্টেশনে নির্ধারিত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সেই তালিকায় ছিল নিরাপদ পানীয় জল, অপেক্ষাগার, বসার জায়গা, প্ল্যাটফর্মের ছাউনি, প্রস্রাবখানা, শৌচাগার, উঁচু প্ল্যাটফর্ম, ফ্যান, ফুট ওভারব্রিজ, ডাস্টবিন, ঘড়ি এবং পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম। কিন্তু ক্যাগের অডিট বলছে, নির্দেশ জারির বহু বছর পরেও নির্বাচিত স্টেশনগুলির বড় অংশে সেই ন্যূনতম পরিষেবাই বাস্তবে নিশ্চিত হয়নি।
৫১২টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫৮টিতে ন্যূনতম অত্যাবশ্যকীয় সুবিধার ক্ষেত্রে ঘাটতি পাওয়া গিয়েছে। শতাংশের হিসাবে তা ৮৯ শতাংশেরও বেশি। কোথাও প্রয়োজনীয় সুবিধা ছিল না, কোথাও আবার পরিষেবা থাকলেও নির্ধারিত মানের তুলনায় তা কম।
এই পরিসংখ্যানের গুরুত্ব আরও বাড়ে ভারতীয় রেলের বিপুল যাত্রীসংখ্যার কথা ভাবলে। ক্যাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, নন-সাবার্বান গ্রুপের আওতায় রয়েছে ৫৯০৮টি রেলস্টেশন। প্রতিদিন ৭৪২৪টিরও বেশি নন-সাবার্বান যাত্রীবাহী ট্রেন চলে এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রায় ২৯২.৪ কোটি নন-সাবার্বান যাত্রী রেলের পরিষেবা নিয়েছেন।
এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ব্যবহারের জায়গায় পানীয় জলের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা তাই নিছক অব্যবস্থার অভিযোগ নয়। বিষয়টি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রী, শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ মানুষের কাছে স্টেশনের পানীয় জল অনেক সময় বাধ্যতামূলক ভরসা। সেই জলেই যদি দূষণের চিহ্ন মেলে, তা হলে বিপদের মাত্রা সহজেই অনুমেয়।
আর এখানেই ক্যাগের রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রেল বোর্ডের নির্দেশিকা যদি থাকে, তা হলে তার বাস্তবায়ন হচ্ছে কোথায়? জল সরবরাহের আগে নিয়মিত পরীক্ষা হচ্ছে কি না, পরীক্ষায় দূষণ ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে কি না—এই নজরদারি কতটা কার্যকর, রিপোর্টের তথ্য সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।
রেলের বিশাল নেটওয়ার্কে প্রতিটি স্টেশনে একই মানের পরিষেবা বজায় রাখা নিঃসন্দেহে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু নিরাপদ পানীয় জল বা পরিষ্কার শৌচাগারকে সেই চ্যালেঞ্জের অজুহাতে পিছিয়ে রাখা যায় না। এগুলি বিলাসিতা নয়, যাত্রীর মৌলিক প্রয়োজন।
ট্রেন সময়মতো চলছে কি না, নতুন কোচ আসছে কি না, স্টেশনে আধুনিক সুবিধা তৈরি হচ্ছে কি না—এসব নিয়ে রেলের উন্নয়নের ছবি প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু সেই চকচকে ছবির আড়ালে যদি ওয়াটার কুলারের জলে ই-কোলাই থাকে, ৫১২টির মধ্যে ৪৫৮টি স্টেশনে ন্যূনতম পরিষেবাই ঘাটতিতে থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই—যাত্রীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের জায়গাটি কোথায়?
স্টেশনের কল খুলে জল খাওয়ার আগে তাই আর শুধু তেষ্টা মেটানোর কথা নয়, ভরসার কথাও ভাবতে হবে। কারণ রেলযাত্রীর কাছে ওয়াটার কুলার মানেই নিরাপদ জল—এই স্বাভাবিক বিশ্বাসটাই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তা হলে সেই জল আর নিছক জল থাকে না। হয়ে ওঠে অদৃশ্য এক বিপদের সম্ভাবনা। ক্যাগের রিপোর্ট সেই বিপদের দিকেই আঙুল তুলেছে।