হায়দ্রাবাদ: জীবনে এসেছে চরম আর্থিক অনটন, পরিবারের প্রত্যাখ্যান, এমনকি নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াইও করতে হয়েছে। কিন্তু কোনও বাধাই থামাতে পারেনি তাঁর পথচলা। সমস্ত প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে ইতিহাস গড়লেন হায়দরাবাদের চিকিৎসক কোয়ালা রুথ জন পল। ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী ব্যক্তি হিসেবে স্নাতকোত্তর মেডিক্যাল কোর্স সম্পন্ন করার নজির গড়েছেন তিনি।
শনিবার, ১০ অক্টোবর, প্রকাশিত এমডি/এমএস পরীক্ষার ফলাফলে সমস্ত বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন রুথ। ২০২৩-২৬ শিক্ষাবর্ষে হায়দরাবাদের সনৎনগরের ইএসআইসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ইমার্জেন্সি মেডিসিনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের কাছেও এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
সাফল্যের পর উচ্ছ্বসিত রুথ বলেন, এই অর্জন তাঁর এবং গোটা সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের। দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ছোটবেলা থেকেই কঠিন লড়াই
তেলঙ্গানার খম্মাম জেলার একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম রুথের। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এরপর মায়ের কাছেই বড় হয়ে ওঠা। নিজের জেলাতেই স্কুল ও ইন্টারমিডিয়েটের পড়াশোনা শেষ করে NEET পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর শুরু হয় চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর উচ্চশিক্ষার যাত্রা।
কিন্তু স্নাতক স্তরে পড়ার সময় রূপান্তরকামী নারী হিসেবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। পরিবারের প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েন রুথ। প্রায় ছয় বছর পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল বলে জানা গিয়েছে। সেই সময় আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় তাঁকে।
ভর্তির সুযোগ পেতে আদালতের দ্বারস্থ
২০২১ সালে ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী ক্লিনিক ‘মিত্র ক্লিনিক’-এ কাজ শুরু করেন রুথ, যা বর্তমানে ‘সতরঙ্গ ক্লিনিক’ নামে পরিচিত। সেখানে প্রায় দু’বছর কাজ করার পাশাপাশি স্নাতকোত্তর প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান তিনি।
প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও তাঁর লড়াই শেষ হয়নি। স্নাতকোত্তর মেডিক্যাল কোর্সে ভর্তির প্রক্রিয়ায় রূপান্তরকামী প্রার্থীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় সমস্যায় পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত রূপান্তরকামী অধিকারকর্মী বৈজয়ন্তী বসন্ত মোগলির সহায়তায় তেলঙ্গানা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। প্রায় দু’বছরের আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের অন্তর্বর্তিকালীন নির্দেশে ভর্তির পথ খুলে যায়। ২০২৩ সালে ইএসআইসি মেডিক্যাল কলেজে ইমার্জেন্সি মেডিসিনে ভর্তি হন তিনি।
বৈষম্য পেরিয়ে মানুষের সেবায় রুথ
চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়ও নানা সামাজিক কুসংস্কার ও অস্বস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। তবে রোগীদের যত্ন নিয়ে চিকিৎসা করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁদের আস্থা অর্জন করেছেন রুথ।
এখন তাঁর লক্ষ্য চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, এমন রূপান্তরকামী মানুষের জন্য কাজ করতে চান তিনি। লিঙ্গপরিচয় বা যৌনতার ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য ছাড়াই সকলকে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়াই তাঁর অঙ্গীকার।
রুথ জন পলের এই সাফল্য প্রমাণ করে, সামাজিক বাধা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অধ্যবসায় এবং দৃঢ় সংকল্প মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাঁর এই পথচলা আগামী দিনে বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
