বাংলাদেশে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের আনাগোনা আর সবুজ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা। আজ থেকে কয়েক বছর আগে চিম্বুক পাহাড়ে গিয়েছিলাম পেশাগত এক অ্যাসাইনমেন্টে—হোটেল নির্মাণের পেছনে স্থানীয় আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের নেপথ্য কারণ খুঁজতে। নিরাপত্তার নানা শঙ্কা আর ছদ্মবেশের আড়ালে থেকে সেদিন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন, তাদের অসহায়ত্ব এবং নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে আরও গহীন অরণ্যে সরে যাওয়ার গল্প।
ল্যাংখাই ম্রো এবং বর্ণমালার উপহার
ম্রোরা শুধু ভূমির অধিকার থেকেই বঞ্চিত নয়, তারা পিছিয়ে রয়েছে শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকেও। অথচ এই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি মমতা দেখার মতো। বছরের পর বছর ধরে স্মৃতিতে জমে থাকা সেই ইতিহাস মনে পড়ে—ল্যাংখাই ম্রো (ল্যাং মে) নামের এক তরুণ এই জনগোষ্ঠীর জন্য আবিষ্কার করেছিলেন ‘ক্রামডি’ বর্ণমালা। এরপর তিনি হারিয়ে গেলেও ম্রোদের জন্য রেখে গেছেন নিজ ভাষায় আলো ছড়ানোর এক অমর উপহার।
একমুঠো বিস্কুট আর হারিয়ে যাওয়া স্বাদের গল্প
সম্প্রতি আলীকদমের ডিম পাহাড়ের ২১ কিলো এলাকায় এক ম্রো পরিবারের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আবারও বুকটা ভার করে দেয়। দুপুরের প্রখর রোদে দেখলাম, জুম চালের ভাত আর নুন দিয়ে সেদ্ধ করা বাঁশকরলই তাদের দুপুরের আহার। তেল বা মসলা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। বয়লার কিংবা পল্টি মুরগির স্বাদ শেষ কবে পেয়েছিল, তাও তারা ভুলে গেছে বহু আগে। পাহাড়ের সেই সরল, নিষ্পাপ কিশোরী আর মহিলাদের কাছে যখন জানতে চাইলাম তারা কী খাবে—তাদের চাওয়াটা ছিল ভীষণ সাধারণ। মাত্র বিশ টাকার দুই প্যাকেট বিস্কুট আর দুটো চিপস পেয়ে তাদের চোখে-মুখে যে আনন্দের ঝিলিক আর কৃতজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
মায়াময় সেই নিষ্পাপ মুখের টানে...
যেখানে নাগরিক অধিকারের আলো আজও ঠিকমতো পে পৌঁছায়নি, সেখানে এই মানুষগুলো বেঁচে থাকার এক নিরন্তর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই নিষ্পাপ হাসি আর মাটির মানুষের সরলতা বারবার মনে করিয়ে দেয়—ঈশ্বরের অস্তিত্ব যেন ওদের মাঝেই লুকিয়ে আছে। মন চায় বারবার ছুটে যাই সেই পাহাড়ি অরণ্যে, একদিন একটু মসলা আর মুরগি নিয়ে ওদের সাথে বসে একসাথে একবেলা খাই, আর দেখে আসি সেই নিষ্পাপ চোখগুলোর অপার্থিব আনন্দ।