নিউজ ডেস্ক: চাকচিক্য আর থিমের দমকা হাওয়ায় যখন শহর কিংবা মফস্সলের সাবেকিয়ানা ফিকে হয়ে আসছে, ঠিক তখনই ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের এক চিলতে ভূখণ্ডে জীবন্ত হয়ে ওঠে ২২৬ বছরের এক অমলিন ইতিহাস। হবিবপুর ব্লকের তিলাসন এলাকা। সীমান্তের কাঁটাতার থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্ব মাত্র ৫০ মিটার এপারে দাঁড়িয়ে থাকা সিঙ্গাবাদের রায় জমিদার বাড়ি। দেওয়ালের চুন-সুরকি খসে পড়েছে, বয়সের ভারে ফাটল ধরেছে বিশাল অট্টালিকায় কিন্তু সপ্তমী পুজোর সকালে যখন শূন্যে ছোড়া হয় বন্দুকের পাঁচ রাউন্ড গুলি, তখন যেন পলকের জন্য ফিরে আসে সেই ব্রিটিশ আমলের জমিদারি জাঁকজমক।মনে পড়ে যায় পুরনো দিনের সেই কথা।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, সুদূর উত্তরপ্রদেশ থেকে বাংলায় ডালের ব্যবসা করতে এসেছিলেন অবোধ নারায়ণ রায়। সিঙ্গাবাদ স্টেশনে ট্রেনে করে ডাল এনে নৌকাযোগে তা পাঠানো হতো রাজশাহী, ঢাকা কিংবা কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে। পরবর্তীতে ব্যবসার সুবিধার্থে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে প্রায় তিন হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি এই এলাকার জমিদারি কিনে নেন। এলাকায় সুখ-সমৃদ্ধি ফেরাতে তিন সাধুর নির্দেশে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের নির্মম কাঁটাতারে জমিদারি স্টেটের সিংহভাগ পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেলেও, মূল ভিটে আর পুজোর ঐতিহ্য রয়ে গেছে ভারতীয় ভূখণ্ডেই।
কালের নিয়মে জমিদারি প্রথা লুপ্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আচার-অনুষ্ঠানের রাশ আলগা হতে দেননি পরিবারের উত্তরসূরিরা। পুজো ঘিরে এখানকার রীতিনীতি সত্যিই চমকপ্রদ। সপ্তমীর ভোরে পুনর্ভবা নদী থেকে ঘট ভরে জল আনার মাধ্যমেই সূচনা হয় মূল পুজোর। আর সেই শুভক্ষণেই শূন্যে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে দেবীকে আহ্বান জানানো হয়।
রায় পরিবারের আদি শিকড় উত্তরপ্রদেশে হওয়ায় পুজোর আচারে আজও টিকে রয়েছে হিন্দি বলয়ের ছোঁয়া।
প্রতিমার কাঠামো পুজো থেকে শুরু করে চারদিনের ভোগ রান্না সমস্ত আচার নিষ্ঠার সঙ্গে সামলান উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা মৈথিলী ব্রাহ্মণরা। পুজো উপলক্ষে আজও চারদিন ধরে চলে অবারিত পাত পেড়ে খাওয়ার আয়োজন। দশমীর বিকেলে সেই পুনর্ভবা নদীর বুকেই চোখের জলে বিদায় জানানো হয় উমাকে।
একসময় দেশভাগের পরও ওপার বাংলা থেকে মানুষ ভিসা-পাসপোর্টের তোয়াক্কা না করে ছুটে আসতেন রায় বাড়ির এই পুজো দেখতে। এখন কড়া সীমান্ত পাহারার কারণে সেই অবাধ যাতায়াত বন্ধ হলেও, পুজোর আবেগে এতটুকু মরচে ধরেনি।
মণ্ডপে মণ্ডপে এখন রঙের গন্ধ, চলছে প্রতিমার শেষ মুহূর্তের তুলির টান। আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা। তারপরই পুনর্ভবার বাতাসে ভেসে আসবে গুলির শব্দ, আর ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠবে সীমান্ত গ্রাম তিলাসন।
