ওয়াশিংটন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে ক্ষমতার অলিন্দে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন স্টিফেন মিলার। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান রূপকার মিলারকেই হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে বেছে নিলেন ট্রাম্প। আগামী সোমবার থেকে দায়িত্ব নেবেন 41 বছর বয়সি মিলার। এত দিন এই পদে ছিলেন সুসি ওয়াইলস। তাঁর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতার কেন্দ্রেও বড়সড় রদবদল ঘটল। এই নিয়োগের রাজনৈতিক তাৎপর্য যথেষ্ট।
সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ধাক্কা এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রাম্প প্রশাসন আরও আক্রমণাত্মক পথে হাঁটতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। বিশেষ করে অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বিরোধীদের মোকাবিলায় মিলারের অবস্থান যে কঠোর, তা আগেই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে তাঁর হাতে চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব যাওয়া মানে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আরও কড়া প্রয়োগের ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
১. ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকায় বেড়ে ওঠা মিলার ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থাতেই রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য পরিচিতি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রপত্রে তাঁর লেখা কলাম ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। 2007 সালে স্নাতক হওয়ার পর ওয়াশিংটনে গিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। প্রথমে কংগ্রেস সদস্য মিশেল বাখম্যান এবং পরে সেনেটর জেফ সেশন্সের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন তিনি।
2015 সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন মিলার। পরে ট্রাম্পের বক্তৃতা লেখক এবং নীতিনির্ধারণী উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। 2017 থেকে 2021 সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও প্রশাসনের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ ছিলেন তিনি। 2020 সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পর ‘আমেরিকা ফার্স্ট লিগ্যাল’ নামে একটি রক্ষণশীল আইনি সংগঠন গড়ে তোলেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উপদেষ্টার দায়িত্ব পান।
২. অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান রূপকার
মিলারের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অভিবাসন নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থান। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। সূত্রের খবর, প্রতিদিন 3,000 জনকে গ্রেফতারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পেছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল। শুধু অপরাধে অভিযুক্ত অভিবাসী নয়, আমেরিকায় অবৈধ ভাবে বসবাসকারী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে অভিযানের আওতায় আনার পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার সীমিত করার পক্ষেও সরব হয়েছেন মিলার। এই নীতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আদালতের সংঘাতও হয়েছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকার কারণে সমর্থকদের কাছে তিনি ট্রাম্পের কঠোর সীমান্ত নীতির অন্যতম মুখ। অন্য দিকে, মানবাধিকার সংগঠন এবং ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, এই নীতির প্রয়োগে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ করা হয়েছে।
৩. শুধু অভিবাসন নয়, প্রশাসনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রভাব
মিলারের ক্ষমতা শুধু অভিবাসন দফতর বা সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে তাঁর প্রভাব রয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা ও নির্বাহী আদেশ তৈরির প্রক্রিয়াতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত কর্মসূচির বিরোধিতা, সরকারি কর্মীসংখ্যা কমানো এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়েও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট।
হোয়াইট হাউসের ভিতরে তাঁকে নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—পদবিতে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হলেও নীতিনির্ধারণে তাঁর প্রভাব অনেক সময় চিফ অব স্টাফের সমান। প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের কাজও করেছেন তিনি। নতুন দায়িত্বে সেই ক্ষমতা আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে চলেছে।
৪. বিদেশনীতি ও সামরিক পদক্ষেপেও কড়া অবস্থান
মিলারের প্রভাব অভ্যন্তরীণ নীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভেনেজুয়েলা, ইরান এবং লাতিন আমেরিকা সংক্রান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান সমর্থন করেছেন তিনি। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন।
ইরান সংঘাতের সময়ও ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করেছেন মিলার। তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পাশাপাশি সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও তাঁর প্রভাব কতটা বাড়ে, সে দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
৫. সুসি ওয়াইলসের বিদায়, ট্রাম্পের নীতিতে কি আরও কড়াকড়ি?
সুসি ওয়াইলস ছিলেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম চিফ অব স্টাফ। এই পদে বসা প্রথম মহিলা হিসেবেও ইতিহাস তৈরি করেছিলেন তিনি। ট্রাম্পের 2024 সালের নির্বাচনী প্রচার পরিচালনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হোয়াইট হাউসের অস্থির কর্মপরিবেশে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও পরিচিত ছিলেন ওয়াইলস।
শুক্রবার তাঁর বিদায়ের কথা ঘোষণা করে ট্রাম্প বলেন, ওয়াইলস ভাল কাজ করেছেন। তবে পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। ওয়াইলস এ বার ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংগঠনের কাজে যুক্ত হবেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁর জায়গায় মিলারকে আনার সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তনের বদলে আরও কঠোর প্রয়োগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
মিলারের নিয়োগে ডেমোক্র্যাট শিবিরের প্রতিক্রিয়া অবশ্য তীব্র। সেনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। হাউস ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসও মিলারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, অভিবাসন নীতির নামে প্রশাসন অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ করেছে। অন্য দিকে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল এই নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে।
মিলার দায়িত্ব নিচ্ছেন এমন এক সময়ে, যখন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তি বাড়ছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন চিফ অব স্টাফের সামনে শুধু প্রেসিডেন্টের নীতি বাস্তবায়ন নয়, বিরোধী কংগ্রেসের সঙ্গে সংঘাত সামলানোর চ্যালেঞ্জও থাকবে। ট্রাম্পের আস্থাভাজন এই উপদেষ্টা হোয়াইট হাউসের প্রশাসনিক কাঠামোকে কতটা নিজের ছাঁচে গড়ে তুলতে পারেন, এখন সেটাই দেখার।




