লখনউ: এক সময়ে হকির মাঠে তাঁর গোলের অপেক্ষায় থাকত সতীর্থরা। প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে বল পাঠাতে পারদর্শী সেই তরুণী খেলেছিলেন জাতীয় স্তরে চার বার। স্বপ্ন ছিল আরও দূর যাওয়ার। কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে, দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন, আর্থিক অনটন এবং সন্তানের দায়িত্ব—এক এক করে বদলে দিয়েছিল জীবনের গতিপথ। শেষ পর্যন্ত খেলার মাঠ ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়েছিল রাস্তায়। আজ লখনউয়ের রাস্তায় অটোর স্টিয়ারিং হাতে সেই মালতীই। তাঁর পরিচয়, তিনি এক সময়ে জাতীয় স্তরের হকি খেলোয়াড় ছিলেন। আর তাঁর নিজের দাবি, 2013 সালে লখনউয়ে প্রথম মহিলা হিসাবে ই-রিকশা চালানো শুরু করেছিলেন তিনিই।
ছ’বছর বয়সে হকির সঙ্গে পরিচয় মালতীর। ছোটবেলা থেকেই খেলাটির প্রতি ছিল প্রবল টান। ধীরে ধীরে রাজ্য স্তরের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্তরে পৌঁছন। চার বার জাতীয় প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন বলে জানিয়েছেন তিনি। খেলতেন সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে। ভুবনেশ্বর ও আগরায় জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্মৃতিও এখনও তাঁর মনে উজ্জ্বল। উত্তরপ্রদেশের কেডি সিং হস্টেলে থাকার সময় তাঁর গোল করার দক্ষতা নিয়ে সতীর্থদের মধ্যে ছিল যথেষ্ট উচ্ছ্বাস।
কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার পথে পরিবারের সমর্থন পাননি মালতী। তাঁর কথায়, বাবা চাইতেন না তিনি খেলাধুলো চালিয়ে যান। পরিবারে ছেলে না থাকায় দ্রুত বিয়ে দেওয়াই নাকি ভালো বলে মনে করেছিলেন বাড়ির লোকজন। 2000 সালে, কৈশোর পেরোনোর আগেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। যে বিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেটাই পরে হয়ে ওঠে দীর্ঘ লড়াইয়ের কারণ।
সন্তানের জন্মের পরেও বদলায়নি পরিস্থিতি
মালতীর নিজের কথায়, দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। তাঁকে নিয়মিত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হত। প্রথম দিকে কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় পরিস্থিতি সহ্য করেই থাকতে হয়েছিল। 2004 সালে জন্ম হয় তাঁর ছেলের। কিন্তু সন্তান আসার পরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই স্বামীর বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ফিরে আসেন বাবা-মায়ের কাছে। কিন্তু শুধু নিজের জীবন নয়, ছেলের দায়িত্বও তখন তাঁর কাঁধে। প্রয়োজন ছিল নিয়মিত আয়ের। সেই সময় হকিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং দক্ষতা। তাই খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কোচিংয়ের পেশায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
2005 সালে লখনউয়ের বাবু বনরসী দাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হকি দলের কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে বাবু বনরসী দাস ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে স্পোর্টস অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব সামলান। কিন্তু ছেলের অসুস্থতার কারণে 2007 সালে সেই চাকরি ছাড়তে হয় তাঁকে। ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে পরিবার।
2013 সালে ই-রিকশার স্টিয়ারিং হাতে
জীবন চালাতে শেষ পর্যন্ত এমন একটি পেশা বেছে নিতে হয়, যা তখনও মহিলাদের জন্য প্রায় অচেনা। 2013 সালে লখনউয়ের রাস্তায় ই-রিকশা চালানো শুরু করেন মালতী। তাঁর দাবি, সেই সময়ে শহরে তিনিই ছিলেন একমাত্র মহিলা ই-রিকশাচালক।
শুরুর দিনগুলি সহজ ছিল না। কেউ তাঁকে দেখে হাসাহাসি করতেন, কেউ আবার মহিলা চালকের গাড়িতে উঠতেই চাইতেন না। পরিচিতদের একাংশের মন্তব্যও শুনতে হয়েছিল। এমনকী, মেয়েকে রিকশা চালাতে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন তাঁর বাবা। মালতীর কথায়, বাবা চাননি মেয়ে এই পেশায় আসুক। কিন্তু সংসারের আর্থিক প্রয়োজন এবং ছেলেকে বড় করার দায়িত্ব তাঁকে সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে শিখিয়েছিল।
প্রথম দিন রিকশার স্টিয়ারিং হাতে নেওয়ার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে মালতী জানিয়েছেন, সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজের হাতে ফিরে পেয়েছেন। অন্যের উপর নির্ভর না করে নিজের উপার্জনে বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাসই তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
প্রথমে ই-রিকশা চালালেও বর্তমানে অটোরিকশা চালান তিনি। তাঁর দাবি, প্রায় 15 বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। গত দু’বছর ধরে অটো চালাচ্ছেন। যাঁরা এক সময়ে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন, তাঁদের কথায় কান না দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন।
নিজে চালক, অন্য মহিলাদেরও প্রশিক্ষক
মালতীর লড়াই শুধু নিজের জীবনে থেমে থাকেনি। তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও কয়েক জন মহিলা গাড়ি চালানো শিখেছেন। মালতী জানিয়েছেন, তিনি নিজেও কয়েক জন মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
তবে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের কথা উঠলে আক্ষেপ চাপা থাকে না তাঁর গলায়। যে মেয়ে ছোটবেলা থেকে কঠোর অনুশীলন করে জাতীয় স্তরে পৌঁছেছিল, তাকে শেষ পর্যন্ত জীবিকার তাগিদে রিকশার স্টিয়ারিং ধরতে হল—এই পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে মালতীর। তাঁর বক্তব্য, এত পরিশ্রম করেও একজন মহিলা খেলোয়াড়কে যদি শেষ পর্যন্ত জীবিকার জন্য এমন লড়াই করতে হয়, তা হলে সরকারেরও আত্মসমালোচনা করা উচিত।
নিজের পদবি নিয়েও আলাদা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। স্বামীর পদবি আর ব্যবহার করতে চান না মালতী। তাঁর যুক্তি, নিজের জীবন এবং ছেলেকে তিনি একাই সামলেছেন। তাই অন্য কারও পদবি বহন করার প্রয়োজন বোধ করেন না। হকির মাঠ থেকে কোচিং, সেখান থেকে লখনউয়ের রাস্তায় অটো চালানো- মালতীর জীবনের এই বদল কেবল পেশা পরিবর্তনের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক বাধা, পারিবারিক প্রতিকূলতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং একা হাতে সন্তানকে বড় করে তোলার লড়াই। তাঁর নিজের কথায়, তিনি কারও কাছে হারতে চাননি। সেই জেদই তাঁকে বার বার নতুন করে শুরু করার সাহস জুগিয়েছে।




