বিশেষ প্রতিবেদন: রাজপরিবারের জৌলুস বজায় রাখতে ব্রিটেনের করদাতাদের কত টাকা খরচ হয়? রাজা তৃতীয় চার্লসের সরকারি কাজকর্ম, রাজপ্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন এবং বিদেশ সফরের খরচ মেটাতে 2026-27 অর্থবর্ষে বরাদ্দ হয়েছে 137.9 মিলিয়ন পাউন্ড। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় 1,600 কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে এই বিপুল বরাদ্দ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। নতুন আইন কার্যকর হলে 2027-28 অর্থবর্ষ থেকে সেই অনুদান কমে দাঁড়াতে পারে 99.9 মিলিয়ন পাউন্ডে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় প্রায় 38 মিলিয়ন পাউন্ড বা 27 শতাংশেরও বেশি কমতে পারে রাজপরিবারের সরকারি বরাদ্দ।
ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আর্থিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এই প্রস্তাব ঘিরে। এক দিকে রাজা চার্লসের সরকারি খরচের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ, অন্য দিকে রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও আয়ের পরিমাণ, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, রাজতন্ত্র চালাতে করদাতাদের কতটা অর্থ ব্যয় করা যুক্তিসঙ্গত? বিশেষ করে রাজা চার্লসের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়ামের হাতে থাকা ডাচি অব কর্নওয়ালের সম্পত্তির মূল্য প্রায় 1.2 বিলিয়ন পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে সাম্প্রতিক আলোচনায়।
কী এই ‘সোভেরেন গ্রান্ট’?
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সরকারি কাজকর্মের খরচ মেটাতে সরকার যে অর্থ বরাদ্দ করে, তার নাম ‘সোভেরেন গ্রান্ট’। 2012 সাল থেকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজপরিবারের সরকারি দায়িত্ব পালনের খরচ বহন করা হয়। রাজা বা রানি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যে সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন, তার সঙ্গে যুক্ত ব্যয় মেটানোই এই অনুদানের উদ্দেশ্য।
এই অর্থ থেকে রাজপ্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ, রাজপরিবারের সরকারি সফর, কর্মীদের বেতন এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের খরচ দেওয়া হয়। অর্থাৎ এই অনুদান রাজা বা রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত পকেটের টাকা নয়। বাকিংহাম প্যালেসের মতো ঐতিহাসিক ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং রাজপরিবারের সরকারি কাজ চালানোর পরিকাঠামো বজায় রাখতেই মূলত এই অর্থ খরচ হয়।
2026-27 অর্থবর্ষে এই অনুদানের পরিমাণ 137.9 মিলিয়ন পাউন্ড। 2025-26 অর্থবর্ষে তা ছিল 132.1 মিলিয়ন পাউন্ড। এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্রাউন এস্টেটের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিবেচনা করা হয়। ক্রাউন এস্টেট হল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত বিপুল সম্পত্তি ও জমিজমার একটি স্বতন্ত্র সংস্থা। এর আয় সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে। রাজা ব্যক্তিগত ভাবে এই সম্পত্তির মালিক নন, কিংবা ইচ্ছেমতো তা বিক্রি করে অর্থ নিজের কাছে রাখতে পারেন না।
কেন কমছে বরাদ্দ?
বাকিংহাম প্যালেসের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও আধুনিকীকরণের জন্য গত কয়েক বছর ধরে রাজপরিবারের সরকারি অনুদানে অতিরিক্ত অর্থ রাখা হয়েছিল। প্রাসাদের পুরনো বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা বদলানো, অগ্নিকাণ্ড ও বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং ভবনটির পরিকাঠামো আধুনিক করার জন্য এই অর্থ প্রয়োজন ছিল।
এ বার সেই সংস্কার প্রকল্প শেষের পথে। ফলে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন কমবে বলে মনে করছে ব্রিটিশ সরকার। সেই কারণেই 2027-28 অর্থবর্ষ থেকে সোভেরেন গ্রান্ট কমিয়ে 99.9 মিলিয়ন পাউন্ড করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। 2026 সালের জুনে প্রকাশিত রাজকীয় ট্রাস্টিদের পর্যালোচনায় এই নতুন অঙ্কের সুপারিশ করা হয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সংসদে ‘সোভেরেন গ্রান্ট বিল’ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সংসদে বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, বাকিংহাম প্যালেসের সংস্কারের জন্য যে অস্থায়ী অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেই কাজ শেষ হলে অনুদানও বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমানো উচিত। তবে রাজপ্রাসাদের অন্যান্য ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের খরচ, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো খাতে অর্থের প্রয়োজন থাকবে।
উইলিয়ামের হাতে 1.2 বিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি!
রাজপরিবারের সরকারি অনুদান নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে প্রিন্স উইলিয়ামের সম্পত্তির পরিমাণও। ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী উইলিয়াম বর্তমানে ডাচি অব কর্নওয়ালের দায়িত্বে রয়েছেন। এই বিশাল সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে জমি, কৃষিজমি, আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ। এর আনুমানিক সম্পত্তিমূল্য 1.2 বিলিয়ন পাউন্ড।
তবে এই সম্পত্তির মূল্য এবং উইলিয়ামের ব্যক্তিগত বার্ষিক আয় এক বিষয় নয়। ডাচি অব কর্নওয়াল একটি ঐতিহাসিক সম্পত্তি-সংস্থা। এর সম্পদ ব্যক্তিগত ভাবে বিক্রি করে দেওয়ার অধিকার উইলিয়ামের নেই। ডাচির পরিচালন খরচ বাদ দিয়ে যে উদ্বৃত্ত আয় থাকে, তা প্রিন্স অব ওয়েলসের সরকারি ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
একই ভাবে রাজা চার্লসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার। সেখান থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত আয় তাঁর প্রিভি পার্স বা ব্যক্তিগত অর্থভান্ডারে যায়। অর্থাৎ সোভেরেন গ্রান্ট ছাড়াও রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের আয়ের পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে।
কর দেন রাজা ও রাজপুত্র?
ব্রিটিশ আইনে রাজা এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর আয়ের উপর কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সাধারণ নাগরিকদের মতো নয়। তবে 1993 সাল থেকে রাজপরিবারের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় আয়কর ও মূলধনী লাভের কর দেওয়ার রীতি চালু রয়েছে। ডাচি থেকে পাওয়া আয় এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের উপার্জনের উপর কর দেন রাজা ও তাঁর উত্তরাধিকারী। সরকারি সোভেরেন গ্রান্টের উপর অবশ্য ব্যক্তিগত আয়কর দিতে হয় না।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, রাজা চার্লস 2024-25 অর্থবর্ষে 12.9 মিলিয়ন পাউন্ড কর দিয়েছেন। রাজা হওয়ার পর থেকে তাঁর মোট কর প্রদানের পরিমাণ 30 মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়েছে বলে রাজপরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। অন্য দিকে, প্রিন্স উইলিয়ামও 2024-25 অর্থবর্ষে 7.76 মিলিয়ন পাউন্ড কর দিয়েছেন বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।
রাজপরিবারের খরচ নিয়ে বিতর্ক কেন?
ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি, রাজপরিবার শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিষ্ঠান নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পর্যটন এবং দেশের ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের অভ্যর্থনা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফরের মাধ্যমে ব্রিটেনের কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে রাজপরিবারের ভূমিকা রয়েছে বলেও তাঁদের দাবি।
অন্য দিকে সমালোচকদের বক্তব্য, জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও সামাজিক সুরক্ষার উপর চাপের সময়ে রাজপরিবারের জন্য এত বিপুল সরকারি অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। তাঁদের মতে, রাজপরিবারের নিজস্ব সম্পত্তি ও আয়ের পরিমাণ বিবেচনায় রেখে সরকারি অনুদানের কাঠামো আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত পরিবর্তন সেই বিতর্কেরই একটি অংশ। তবে 137.9 মিলিয়ন পাউন্ড থেকে 99.9 মিলিয়ন পাউন্ডে অনুদান কমলেও রাজতন্ত্রের সরকারি ব্যয়ের পুরো হিসাব এতে ধরা পড়ে না। রাজপরিবারের নিরাপত্তার খরচ-সহ কিছু ব্যয় আলাদা ভাবে বহন করা হয়। ফলে রাজতন্ত্রের মোট আর্থিক বোঝা কত, তা নির্ধারণ করতে হলে সরকারি অনুদানের বাইরের খরচও বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, রাজা চার্লসের আমলে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আর্থিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বাকিংহাম প্যালেসের সংস্কার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অনুদান কমানোর উদ্যোগ এক দিকে করদাতাদের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা, অন্য দিকে রাজপরিবারের বিপুল সম্পত্তি ও আয়ের কাঠামোকে ঘিরে স্বচ্ছতার দাবি আরও জোরালো করছে।




