স্পোর্টস ডেস্ক: বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপে নামার আগে স্বপ্ন দেখাচ্ছে দুরন্ত ছন্দ। টানা ১৯টি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জয়, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা, এশিয়ান গেমসে সোনা— সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে ভারতের সুজিত কালকল। বৃহস্পতিবার কাজাখস্তানের আস্তানায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ৬৫ কেজি বিভাগে অভিযান শুরু করবেন তিনি। লক্ষ্য, বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তবে সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা ইরানের রহমান আমুজাদ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক্সে রুপোজয়ী এই কুস্তিগিরই বিভাগে শীর্ষ বাছাই। ৩২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে সুজিতের স্থান দ্বিতীয়।
২০২২ ও ২০২৫ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন আমুজাদ। এ বারের এশিয়ান গেমসে অবশ্য তাঁকে দেখা যায়নি। ফলে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গত বছরের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে আমুজাদের বিরুদ্ধে দারুণ লড়াই করেছিলেন সুজিত। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬-৫ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল তাঁকে। ওই লড়াইয়ে সুজিতই একমাত্র প্রতিযোগী ছিলেন, যিনি আমুজাদকে কার্যত চাপে ফেলে দিয়েছিলেন। সেই হার থেকেই যেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শপথ নিয়েছিলেন ২৩ বছরের ভারতীয় কুস্তিগির।
তার পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তিরানা ও জাগ্রেবে আন্তর্জাতিক ক্রমতালিকার প্রতিযোগিতায় সোনা জিতেছেন সুজিত। তার পর এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং এশিয়ান গেমসেও সোনা জিতে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। এশিয়ান গেমসে জাপানের অলিম্পিক্স চ্যাম্পিয়ন কোটারো কিয়ুকাকে হারানো তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। একই প্রতিযোগিতায় তাজিকিস্তানের আবদুলমজিদ কুদিয়েভের বিরুদ্ধে সোনার লড়াইয়ে ২-৯ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। দ্বিতীয় পর্বে একের পর এক আক্রমণে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করে দেন সুজিত। শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেন।
কিয়ুকার বিরুদ্ধে তাঁর রক্ষণও ছিল নজরকাড়া। প্রতিপক্ষের পা লক্ষ্য করে আক্রমণ সামলে কঠিন পরিস্থিতি থেকেও পয়েন্ট আদায়ের সুযোগ তৈরি করেছিলেন তিনি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও বড় সাফল্য আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে ৬৫ কেজি বিভাগে লড়াই সহজ হবে না। তাজিকিস্তানের কুদিয়েভ, রাশিয়ার আবাসগাজি মাগোমেদভ এবং জাপানের কাইসেই তানাবে রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায়। মাগোমেদভ ২০২১ সালে ৬১ কেজি বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। অন্যদিকে, তানাবে ২০২৫ সালের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে সুজিতকে।
এশিয়ান গেমসের পর থেকেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতিতে মন দিয়েছেন তিনি। ভারতের ফ্রিস্টাইল দলের নতুন কোচ শাকো বেনতিনিদিসের অধীনে আক্রমণাত্মক কুস্তির উপর বাড়তি জোর দিয়েছেন সুজিত। এশিয়ান গেমসের পর নিজের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, কোচ তাঁকে আরও বেশি আক্রমণ করতে বলেছেন। রাশিয়ার একটি প্রতিযোগিতায় জিতলেও তাঁর আক্রমণের পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না কোচ। সেই পরামর্শ মেনে অনুশীলনে পরিবর্তন আনেন তিনি। তার ফলই দেখা গিয়েছে এশিয়ান গেমসে।
সুজিতের কথায়, ফাইনালে তাঁর প্রতিটি আক্রমণ সফল হচ্ছিল। তাতে আরও বেশি উৎসাহ পাচ্ছিলেন তিনি এবং পয়েন্ট বাড়ানোর দিকে মন দিতে পারছিলেন। এই মানসিকতা নিয়েই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নামতে চলেছেন তিনি।
ভারতের হয়ে একই ওজন বিভাগে এক সময় লড়েছেন বজরং পুনিয়াও। ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে উঠেও জাপানের তাকুতো ওতোগুরোর কাছে ১৬-৯ ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন বজরং। এ বার সুজিতের সামনে সেই অপূর্ণতা পূরণের সুযোগ। টানা জয় এবং এশিয়ান গেমসের সাফল্য তাঁকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আমুজাদকে হারাতে হলে নিজের সেরা কুস্তি মেলে ধরতেই হবে।
এ বারের প্রতিযোগিতায় ভারতের হয়ে ৫৭ কেজি বিভাগে নামবেন রাহুল, ৬১ কেজিতে নিখিল, ৬৫ কেজিতে সুজিত কালকল, ৭০ কেজিতে বিশাল কালিরামন, ৭৪ কেজিতে সাগর জগলান, ৭৯ কেজিতে সৌরভ যাদব, ৮৬ কেজিতে পুষ্পেন্দর দালাল, ৯২ কেজিতে সচিন, ৯৭ কেজিতে ভিকি এবং ১২৫ কেজিতে জসপুরণ সিং। এশিয়ান গেমসে সোনা জয়ী আমন সেহরাওয়াত এ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিচ্ছেন না। ফলে ৫৭ কেজি বিভাগে রাহুলের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার বড় সুযোগ রয়েছে। ৭৪ কেজি বিভাগে সাগর জগলানকেও নজরে রাখছেন কোচ বেনতিনিদিস।
বিশ্বের সেরা কুস্তিগিরদের বিরুদ্ধে নিজেদের মাপার পাশাপাশি ভারতের লক্ষ্য পদক জয়। আর সুজিতের কাছে এই প্রতিযোগিতা শুধু আর একটি আন্তর্জাতিক আসর নয়—গত বছরের অল্পের জন্য হারানো লড়াইয়ের জবাব দেওয়ারও মঞ্চ।




