মেদিনীপুর: ন’দিনের পুলিশি হেফাজত শেষ হয়েছে। কিন্তু তদন্তে উঠে এসেছে একের পর এক নতুন তথ্য। বালি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ‘প্রোটেকশন মানি’ নেওয়া, জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগের মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়কে ফের দু’দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিল মেদিনীপুর আদালত। তদন্তকারী সংস্থার তরফে আরও চার দিনের হেফাজত চাওয়া হয়েছিল। দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে দু’দিনের হেফাজত মঞ্জুর করেন বিচারক।
তদন্তকারীদের দাবি, গত ন’দিনের জিজ্ঞাসাবাদে সুমিতের মোবাইল ও সিমকার্ড ব্যবহারের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। নিজের সিমের পাশাপাশি অন্য ব্যক্তিদের নামে নথিভুক্ত একাধিক সিম ব্যবহার করতেন সুমিত—এমনই দাবি পুলিশের। ওই নম্বরগুলি ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনও হয়েছে বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য।
আর সেই সিমগুলির মালিকদের পরিচয় ঘিরেই এখন তদন্তে নতুন প্রশ্ন। পুলিশের দাবি, সুমিত যে সিমগুলি ব্যবহার করতেন, তার বেশির ভাগই কালীঘাট ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নামে নথিভুক্ত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চাওয়া হবে, কী ভাবে তাঁদের নামে থাকা সিম সুমিতের হাতে পৌঁছল। শুধু তা-ই নয়, ওই ব্যক্তিদের সুমিতের মুখোমুখি বসিয়ে জেরার পরিকল্পনাও রয়েছে তদন্তকারীদের। পুলিশের বক্তব্য, এখনও বেশ কয়েকটি সিম সক্রিয়। ফলে সেগুলির মালিকেরা আদৌ নিজেরাই সিম অন্য কাউকে দিয়েছিলেন, নাকি কোনও ভাবে তাঁদের কাছ থেকে তা নেওয়া হয়েছিল—সেই বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি।
আদালতে সরকারি আইনজীবীর দাবি, ন’দিনের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সুমিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। অন্যের নামে থাকা সিম ব্যবহার এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে টাকা লেনদেনের বিষয়ও জেরায় উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই লেনদেনের সূত্র ধরে আরও কয়েক জনের সঙ্গে সুমিতের যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের দাবি, যাঁদের সঙ্গে সুমিতের যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তাঁদের অনেকের ঠিকানাই কালীঘাটের আশপাশে। ফলে ওই যোগাযোগের পিছনে কী কারণ ছিল, সিম ব্যবহারের সঙ্গে তাঁদের কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না এবং আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র কী—তা জানতে চাইছে পুলিশ।
তবে সুমিতের আইনজীবী পুলিশের আরও হেফাজতের আবেদনের বিরোধিতা করেন এবং জামিনের আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত আদালত দু’দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়। এই মামলার সূত্রপাত শালবনির এক জমি সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে। অভিযোগকারী শেখ ইমরানের দাবি, জমি বিক্রির কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, যে জমি তাঁকে বিক্রি করা হয়েছিল, তার মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চুক্তিপত্র বা বৈধ নথি না পাওয়া এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি শালবনি থানায় অভিযোগ করেন।
সেই অভিযোগের তদন্তে তৎকালীন তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা বিধায়ক সুজয় হাজরার নাম উঠে আসে। তাঁকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সুমিত রায়ের নাম সামনে আসে বলে তদন্তকারীদের দাবি। পরে সুমিতের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। সেপ্টেম্বরে কলকাতা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর থেকে মেদিনীপুর আদালতে সুমিতকে একাধিক দফায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, জমি দেখানো, টাকা পৌঁছনো-সহ বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক জন ‘লিঙ্কম্যান’-এর ভূমিকারও হদিস মিলেছে। অমিত ঘোষ, নিত্যানন্দ রায় এবং লক্ষ্মীকান্ত ভূঁইয়ার নামও তদন্তে এসেছে বলে দাবি পুলিশের।
এ বার তদন্তের নজরে অন্যের নামে থাকা সিম এবং সেই সিমের মাধ্যমে হওয়া কথোপকথন ও আর্থিক লেনদেন। কার নামে সিম, কে ব্যবহার করতেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং সেই যোগাযোগের পিছনে কী উদ্দেশ্য ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই সুমিতকে ফের হেফাজতে নিয়ে জেরা করা হবে। ফলে বালি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ‘প্রোটেকশন মানি’-র অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে অন্যের নামে থাকা সিম এবং কালীঘাট-যোগের যে তথ্য সামনে এসেছে, তা মামলাটিকে নতুন কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।
