পর্দায় তিনি ‘তারা সিং’। এক হাতে লোহার রড, অন্য হাতে সীমান্ত পেরিয়ে ছুটে চলা আবেগ। ‘গদর’-এর সেই চরিত্রকে মনে রাখেননি, এমন দর্শক খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ক্যামেরার পিছনে? সেখানে সানি দেওলের জীবন অনেকটাই আলাদা। মুম্বইয়ের অভিজাত জুহুতে কয়েক দশকের পারিবারিক স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি, মালাবার হিলের বিলাসবহুল ম্যানশন, লোনাভালার বিস্তীর্ণ ফার্মহাউস, মানালির পাহাড়ি ঠিকানা—দেওল পরিবারের সম্পত্তির তালিকাও যেন বলিউডের এক দীর্ঘ ইতিহাস।
সানির নতুন ছবি ‘Batwara 1947’ মুক্তির আগে তাই ফের আলোচনায় এসেছে শুধু তাঁর অভিনয় নয়, তাঁর সম্পত্তিও। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বই এবং দেশের অন্যত্র সানি ও দেওল পরিবারের একাধিক সম্পত্তি রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং আবেগের জায়গাটি অবশ্যই জুহু।
মুম্বইয়ের জুহুতে ‘ধর্মেন্দ্র হাউস’। নামেই বোঝা যায়, বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের কর্তা ধর্মেন্দ্রর পরিচয়। শুধু দামি একটি বাংলো নয়, এই বাড়ি দেওল পরিবারের কাছে কার্যত ইতিহাসের অংশ। বহু বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের আনাগোনা, পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব—সব কিছুর সাক্ষী এই বাড়ি। বিভিন্ন রিপোর্টে এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
মজার বিষয়, বাড়িটির গল্প এখানেই শেষ নয়। সময়ের সঙ্গে পরিবার বড় হয়েছে। ফলে পুরনো বাড়িকেই আরও বড় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি। সানি এবং ববি দেওল মিলে জুহুর এই পারিবারিক বাংলোয় আরও একটি তলা যোগ করার পরিকল্পনা করেছেন বলে খবর। অর্থাৎ, মুম্বইয়ের অত্যন্ত মূল্যবান জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি বিক্রি করে নতুন ঠিকানা নয়—পুরনো বাড়ির সঙ্গেই জুড়ে থাকছে দেওল পরিবারের নতুন প্রজন্ম।
জুহুর বাড়িটির আর একটি বিশেষত্ব—এটি শুধু সম্পত্তি নয়, তারকাখ্যাতির উত্তরাধিকারও। ধর্মেন্দ্র যে সময় হিন্দি ছবির অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে উঠছেন, সেই সময় থেকে দেওল পরিবারের সঙ্গে জুহুর সম্পর্ক। পরে সানি, ববি এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম—বাড়িটির সঙ্গে সেই যোগ আরও গভীর হয়েছে। ফলে আজকের বাজারদর দিয়ে এই বাড়ির মূল্য মাপা গেলেও, পারিবারিক স্মৃতির দাম সম্ভবত তার চেয়ে অনেক বেশি।
তবে দেওল পরিবারের সম্পত্তির গল্পে জুহু একমাত্র অধ্যায় নয়। দক্ষিণ মুম্বইয়ের মালাবার হিল-এও সানি দেওলের একটি বিলাসবহুল ম্যানশনের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মুম্বইয়ের সবচেয়ে অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলির অন্যতম এই মালাবার হিল। সমুদ্রের ধারে, শহরের অন্যতম দামি জমিতে একটি বড় ব্যক্তিগত বাড়ি—স্বাভাবিক ভাবেই তার মূল্যও বিপুল।
ওই বাড়িতে রয়েছে ব্যক্তিগত সিনেমা হল, জিম, সুইমিং পুলের মতো একাধিক বিলাসবহুল ব্যবস্থা। এমনকি হেলিপ্যাড থাকার কথাও কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে। অতিথিদের থাকার জন্যও রয়েছে বড় পরিসর। তবে এই সম্পত্তির সঠিক বাজারমূল্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে অঙ্কগুলি ঘোরাফেরা করছে, সেগুলি মূলত অনুমাননির্ভর।
আর এই জায়গাতেই সানি দেওলের সম্পত্তির গল্পের সঙ্গে সাধারণ বলিউড তারকার জীবনযাত্রার পার্থক্যটা চোখে পড়ে। জুহুর পারিবারিক বাংলো যেখানে উত্তরাধিকারের প্রতীক, মালাবার হিলের ম্যানশন সেখানে ব্যক্তিগত বিলাসিতার ছবি।
মুম্বই শহর ছাড়ালেও দেওল পরিবারের সম্পত্তির বিস্তার কমে না। লোনাভালায় প্রায় ১০০ একরের ফার্মহাউস থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মুম্বইয়ের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে লোনাভালা বরাবরই বলিউড তারকাদের অন্যতম পছন্দের অবকাশযাপন কেন্দ্র। কিন্তু প্রায় ১০০ একর জমির কথা সত্যি হলে, দেওল পরিবারের এই সম্পত্তি নিছক ‘উইকেন্ড হোম’-এর সংজ্ঞার অনেকটাই বাইরে।
সেখানে প্রকৃতি, ব্যক্তিগত পরিসর এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ—তিনটিই মেলে। মুম্বইয়ের ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে গিয়ে কিছুটা নির্জনতা চাইলে এমন ফার্মহাউস যে কোনও তারকা পরিবারের কাছেই বিলাসিতার চূড়ান্ত রূপ।
এর পর রয়েছে মানালি। পাহাড়ের কোলে দেওল পরিবারের একটি বাড়ির কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। মুম্বইয়ের সমুদ্রতীরের উষ্ণতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশ—বরফঢাকা পাহাড়, ঠান্ডা আবহাওয়া আর নিস্তব্ধতা। এক দিকে জুহুর ঝলমলে বলিউড, অন্য দিকে মানালির পাহাড়ি নির্জনতা—দুই মেরুতেই যেন দেওল পরিবারের ঠিকানা।
শুধু ভারতেই নয়, বিদেশেও সম্পত্তি থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে একটি বাড়ির উল্লেখও পাওয়া যায়। ফলে সানি দেওল এবং দেওল পরিবারের রিয়েল এস্টেটের পরিধি শুধু মুম্বইয়ের তারকা-ঠিকানায় আটকে নেই।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। তারকাদের সম্পত্তি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে মূল্য বা আয়তনের তথ্য প্রকাশিত হয়, তার সবটাই সরকারি ভাবে যাচাই করা বাজারমূল্য নয়। কোথাও পুরনো ক্রয়মূল্য, কোথাও আনুমানিক বর্তমান মূল্য, আবার কোথাও সংবাদমাধ্যমের হিসাব—সব মিলিয়েই এই তালিকা তৈরি হয়। ফলে ‘সানি দেওলের মোট সম্পত্তির মূল্য’ বলে যে অঙ্কগুলি বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হয়, সেগুলিকে চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সম্পত্তির এই গল্পের সঙ্গে সানির বর্তমান পেশাগত সময়টাও জড়িয়ে রয়েছে। ‘Batwara 1947’ ছবিতে ফের দেশভাগের আবহে দেখা যাবে তাঁকে। রাজকুমার সন্তোষী পরিচালিত ছবিতে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রীতি জ়িন্টা, আলি ফজ়ল-সহ একাধিক অভিনেতা। ১৪ অগস্ট ২০২৬ ছবিটি মুক্তির কথা। ফলে দেশভাগের গল্প নিয়ে সানির নতুন ছবির আবহেই যেন ফিরে এসেছে দেওল পরিবারের পুরনো ইতিহাসের কথাও।
একটি পরিবার। তিন প্রজন্ম। আর তার সঙ্গে মুম্বইয়ের বদলে যাওয়া রিয়েল এস্টেটের ইতিহাস। ধর্মেন্দ্রর সময়ের জুহু আজকের কোটি-কোটি টাকার জমি। সেই বাড়িতেই এখনও দেওল পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের ঠিকানা। তার পাশে মালাবার হিলের বিলাসিতা, লোনাভালার বিস্তীর্ণ জমি, মানালির পাহাড়ি বাড়ি। অর্থাৎ, পর্দায় সানি দেওলের ‘গদর’ যতটা বড়, পর্দার বাইরে তাঁর পরিবারের সম্পত্তির গল্পও কম বিস্তৃত নয়।
তবু এই তালিকার সবচেয়ে দামী সম্পত্তি কোনটি—তার উত্তর হয়তো টাকার অঙ্কে দেওয়া যায় না। সেটি জুহুর পুরনো বাড়ি। কারণ সেটির দেওয়ালে শুধু ইট-পাথর নেই, আটকে রয়েছে ধর্মেন্দ্রর তারকাখ্যাতির দিন, সানি-ববির বেড়ে ওঠা এবং দেওল পরিবারের কয়েক দশকের স্মৃতি। বাজারে যার দাম ৬০ কোটি টাকা হতে পারে, পরিবারের কাছে তার মূল্য সম্ভবত তার চেয়েও অনেক বেশি।