নয়াদিল্লি: অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে খবর করেছিলেন তিনি। তার পরেই তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হয় একাধিক এফআইআর। গ্রেফতারির আশঙ্কায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সাংবাদিক অভিষেক উপাধ্যায়। এ বার তাঁর গ্রেফতারির উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশই চূড়ান্ত করল শীর্ষ আদালত। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না বলে জানিয়ে দিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। বুধবারের এই নির্দেশকে সাংবাদিকের আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিষেকের বিরুদ্ধে গাজিয়াবাদের একটি পথ-দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিবাদকে কেন্দ্র করে মামলা দায়ের হয়েছিল। অভিযোগ, এক মোটরবাইক আরোহীর সঙ্গে বিবাদের সময় তাঁর গাড়ি বাইকটিকে পিছন থেকে ধাক্কা মারে। তার পর ওই ব্যক্তিকে হুমকি ও গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। মামলায় তফসিলি জাতি ও জনজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছিল। তবে সাংবাদিকের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।
অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদানের টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার কারণেই তাঁকে নিশানা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। গত ২৫ অগস্ট প্রথম দফায় অভিষেককে গ্রেফতারি থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। পরে ৭ সেপ্টেম্বরও আদালত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ না করার নির্দেশ দেয়। বুধবার সেই অন্তর্বর্তী সুরক্ষাকেই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল রাখল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ। ফলে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলিতে আপাতত গ্রেফতারির আশঙ্কা থেকে স্বস্তি পেলেন সাংবাদিক।
আদালত জানিয়েছে, অভিষেকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পথ-বিবাদ সংক্রান্ত এফআইআরের প্রতিলিপি তাঁকে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁর ডিজিটাল যন্ত্রপাতি জমা দেওয়ার জন্য পুলিশের জারি করা নোটিসের উপরেও স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। ওই এফআইআরের বৈধতা নিয়ে যে কোনও আইনি ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ জানানোর স্বাধীনতাও দিয়েছে শীর্ষ আদালত। তবে মামলাটির গুণাগুণ বা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি বেঞ্চ।
এই মামলার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সাংবাদিকের ডিজিটাল গোপনীয়তা এবং সংবাদ সংগ্রহের সূত্রের সুরক্ষা। অভিষেকের বক্তব্য, তাঁর অনলাইন কার্যকলাপের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, সেই তথ্য প্রকাশ্যে এলে খবরের জন্য যাঁরা তাঁকে তথ্য দিয়েছেন, তাঁদের পরিচয়ও বিপদের মুখে পড়তে পারে। সাংবাদিকতার সূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত— এই যুক্তিতেই বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন তিনি।
অভিষেককে পৃথক আবেদন করে ডিজিটাল গোপনীয়তা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষায় নির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরির আর্জি জানানোর অনুমতিও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
ফলে আপাতত গ্রেফতারি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি, তাঁর ডিজিটাল তথ্যের ব্যবহার ও সাংবাদিকতার সূত্রের নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আইনি প্রশ্ন তোলার পথও খোলা থাকল। অভিষেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবী। সাংবাদিকের দাবি, রামমন্দিরে অনুদানের অর্থ নিয়ে তাঁর প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই পথ-বিবাদ সংক্রান্ত মামলাটি দায়ের করা হয়। তাঁর অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের কারণে তাঁকে চাপে রাখতেই এই পদক্ষেপ। যদিও পুলিশি অভিযোগের সত্যতা বা মামলার পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি আদালত।
অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদানের অর্থের হিসাব নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উত্তরপ্রদেশ সরকার এ বিষয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করেছে। তদন্তে অনুদানের টাকা গোনার সময় কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে নগদ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপের বিষয়টি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার উপরেই নির্ভর করছে।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে আপাতত অভিষেক উপাধ্যায়ের গ্রেফতারির আশঙ্কা কমল। একই সঙ্গে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সংবাদ সংগ্রহের সূত্রের গোপনীয়তা— এই তিনটি বিষয়ও নতুন করে আলোচনায় এল। তবে আদালতের এই নির্দেশকে অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি হিসেবে দেখা যাবে না। মামলার বৈধতা এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি।





