কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: গণেশপুজোর উদ্বোধনী মঞ্চ থেকেই বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অতীতের বাম শাসন নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজারহাট-গোপালপুর এলাকায় একটি গণেশপুজোর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ বাম শাসনের সময়ে বাংলার সনাতনী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে পরিকল্পিতভাবে আড়ালে রাখা হয়েছিল। একইসঙ্গে বর্তমান সময়েও ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্যের অন্যতম চর্চিত অংশ ছিল পুজোমণ্ডপের পাশে বামেদের বইয়ের স্টল প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, একসময় পুজোর সময়ে মণ্ডপের পাশে লাল শালু টাঙিয়ে বামেদের বইয়ের স্টল বসত। সেখানে কার্ল মার্ক্স, লেনিনের মতো বিদেশি রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের বই পাওয়া গেলেও স্বামী বিবেকানন্দ, ভারত সেবাশ্রম সংঘ কিংবা বাংলার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বই সহজে পাওয়া যেত না। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই ইতিহাসও যথেষ্ট গুরুত্ব পেত না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গণেশপুজোর মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে কোনও বিভাজন তৈরি করা উচিত নয়। বাঙালি, হিন্দিভাষী, গুজরাটি, মারোয়াড়ি—ভাষা বা সম্প্রদায়ের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সকলকে একসঙ্গে দেশের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর কথায়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কোনও একটি গোষ্ঠীর বিষয় নয়, বরং তা সকলের সম্মিলিত পরিচয়ের অংশ।
বক্তব্যে উঠে আসে ১৯৪৭ সালের ২০ জুনের প্রসঙ্গও। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এবং স্বামী প্রণবানন্দের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু দাবি করেন, তাঁদের আন্দোলনের ফলেই বাঙালি হিন্দুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ একটি আলাদা আবাসভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশভাগের সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
এদিন পুজোর সময় নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, অতীতে পিতৃপক্ষেই পুজোর উদ্বোধনের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, যা বাংলার সনাতনী রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর দাবি, এখন থেকে দেবীপক্ষ তথা মহালয়া থেকেই পুজোর উদ্বোধনের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মহাষ্টমীতে নিয়ম মেনে অঞ্জলি দেওয়ার মতো পুরনো রীতিনীতিও ফিরিয়ে আনার কথা বলেন তিনি।
বাম আমলের প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু আরও অভিযোগ করেন, একসময় পঞ্জিকা, শাস্ত্র, পুরোহিত এবং মন্ত্রোচ্চারণের মতো বিষয়গুলিকে গুরুত্বহীন করার চেষ্টা হয়েছিল। দুর্গাপুজো ও মহালয়ার মতো বাঙালির আবেগের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহ্য নিয়েও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জন নিয়ে অতীতের বিতর্কের প্রসঙ্গও টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজারহাট-গোপালপুরের বিধায়ক তরুণজ্যোতি তেওয়ারী-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি। পুজোর উদ্বোধনে আরতি ও গণেশের পুজোয় অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। এলাকার উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রেও সরকার পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
গণেশপুজোর মঞ্চ থেকে শুভেন্দুর এই বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, বাম আমলের রাজনীতি এবং বাংলার ইতিহাস একসঙ্গে একাধিক ইস্যু তুলে ধরে এদিনের বক্তব্যে কার্যত রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।