কলকাতা: ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামের তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কোলাঘাটের বাড়ি ও অফিসে পুলিশি তল্লাশি ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি বিতর্কে নতুন মোড়। কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের করা শুভেন্দু অধিকারীর মামলাটি খারিজ হয়েছে। মামলার শুনানিতে পুলিশের তরফে আদালতকে জানানো হয়, ওই তল্লাশিতে কোনও কিছু উদ্ধার হয়নি এবং একটি ‘ফাঁকা সিজার লিস্ট’ তৈরি করা হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের মে মাসে। লোকসভা ভোটের আগে কোলাঘাটে শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ি তথা অফিসে পুলিশ তল্লাশি চালায়। শুভেন্দুর অভিযোগ ছিল, বিপুল সংখ্যক পুলিশকর্মী তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলেছিলেন এবং তল্লাশির নামে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। অন্যদিকে পুলিশের দাবি ছিল, একটি মামলায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তির সন্ধানেই ওই তল্লাশি চালানো হয়েছিল।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য মেনে নেননি শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ ছিল, তল্লাশি অভিযানের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। তিনি তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কাছেও বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানান। পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগের তালিকায় পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার-সহ একাধিক আধিকারিকের নাম ছিল।
এই ঘটনার পরই আইনি পথে যান শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য ছিল, পুলিশি অভিযানের সময় বেসরকারি রাজনৈতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেই দাবি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। মামলার শুনানিতে অবশ্য আদালতের সামনে পুলিশের পক্ষ থেকে তল্লাশির ফলাফল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়।
পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, কোলাঘাটের ওই তল্লাশি থেকে কোনও বস্তু উদ্ধার করা যায়নি। এমনকি যে সিজার লিস্ট তৈরি হয়েছিল, সেটিও কার্যত ফাঁকা ছিল বলে আদালতে জানানো হয়। পুলিশ আরও জানায়, তল্লাশিতে কিছু না পাওয়ার কারণে পরবর্তী তদন্তও আর এগোয়নি।
এই বক্তব্যের পর মামলাটি আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলে আদালত মনে করেছে এবং শুভেন্দু অধিকারীর আবেদন খারিজ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর ফলে ২০২৪ সালের সেই তল্লাশি ঘিরে শুভেন্দুর দায়ের করা আইনি লড়াইয়ের এই পর্বের ইতি ঘটল।
ঘটনাটি অবশ্য রাজনৈতিক দিক থেকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তল্লাশির সময় শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা এবং ঘটনাটি হয়েছিল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। ফলে সেই সময় থেকেই পুলিশি অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছিল। শুভেন্দুর অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার, আর পুলিশের বক্তব্য ছিল তদন্তের প্রয়োজনেই অভিযান চালানো হয়েছিল।
কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর ফের সামনে এসেছে সেই পুরনো বিতর্ক। আদালতের সামনে পুলিশের রিপোর্টে ‘কিছু উদ্ধার হয়নি’ এবং ‘ফাঁকা সিজার লিস্ট’-এর উল্লেখ থাকায় মামলাটির শেষ পরিণতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে আদালতের সিদ্ধান্তটি মূলত সংশ্লিষ্ট মামলার আইনি পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তল্লাশির সময়কার রাজনৈতিক অভিযোগগুলির সত্যতা সম্পর্কে এই রায় কোনও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়।
উল্লেখ্য, শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে বা তাঁর করা বিভিন্ন মামলার আইনি অবস্থাও এক নয়। চলতি বছরে কলকাতা হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক মামলা হয়েছে, যার কিছু এখনও বিচারাধীন এবং কিছুতে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই প্রতিটি মামলার তথ্য ও বর্তমান অবস্থাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
