বাঁকুড়া, নিউজ ডেস্ক : বঙ্গের প্রান্তিক জেলাগুলির মধ্যে অন্যতম জঙ্গলমহলের বাঁকুড়া জেলা। একটা সময় ছিল জঙ্গলমহলের নাম শুনলেই রাতের ঘুম উড়ে যেত সাধারণ মানুষের। কারণ মাও আমলে এই এলাকাতেই শোনা যেত ভারী বুটের শব্দ। বাতাসে ভেসে আসতো বারুদের গন্ধ। ক্রমাগতই মাওবাদীদের আনাগোনা থাকতো এই গ্রামে। এবার সেই গ্রামকেই দত্তক নিল খোদ বাঁকুড়া জেলা পুলিশ। শুনে কিছুটা অবাক লাগলেও বাস্তবে এমনই অভিনব কাণ্ড করে বসলো বাঁকুড়া জেলা পুলিশের আধিকারিকেরা।
জঙ্গলের ভিতরে প্রত্যন্ত গ্রাম। এককালে এই গ্রামেরই স্কুলের সামনে মাওবাদীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে পড়েছিল এক কেন্দ্রীয় বাহিনী জোয়ানের দেহ। আর এবার সেই স্কুলের সামনে চিত্রটি বদলে গেলো বাঁকুড়া জেলা পুলিশের উদ্যোগে। এই গ্ৰামের কাঁচা এবড়োখেবড়ো রাস্তা। রয়েছে পানীয় জলের সমস্যা। নেই মোবাইলের সিগন্যালও। এমনই গ্রামকে এবার দত্তক নিল বাঁকুড়া জেলা পুলিশ। ঘটনাচক্রে, এই গ্রামেরই বাসিন্দা রাজ্যের মন্ত্রী তথা স্থানীয় বিধায়ক ক্ষুদিরাম টুডু। শনিবার বিকেলে বারিকুল পঞ্চায়েতের বাগডুবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামের দায়িত্ব নেয় বাঁকুড়া জেলা পুলিশ।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বাগডুবিতে ৬ টি পাড়া। ১০৭ টি পরিবারের বসবাস। ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬০০ জন। সকলেই আদিবাসী সম্প্রদায়ের। গ্রামের একাংশের বাসিন্দা দিনমজুরি করে সংসার চালান। অনেকে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবেও ভিন রাজ্যে কাজ করেন। গ্রামে কয়েকটি টিউবওয়েল ও কুয়োর পাশাপাশি একটি সৌরচালিত সাবমার্সিবল পাম্প রয়েছে। কিন্তু সেটিও মাঝের মধ্যে বিকল হয়ে যায়। নলকূপের জলে আয়রনের সমস্যাও রয়েছে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বর্ষায় কাঁচা রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। চার চাকার গাড়ি ঢুকতে না পারায় অসুস্থ রোগীদের নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কাছাকাছি ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই। বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে। মোবাইলের সিগন্যাল না থাকায় পড়ুয়াদের অনলাইন পড়াশোনাতেও সমস্যা হয়। এ বার এই গ্রামেরই একজন মন্ত্রী হয়েছেন, তার পরে পুলিশও গ্রামটি দত্তক নিল। তাই গ্রামবাসীরা আশা করছেন সমস্যাগুলি মিটবে। রবিবার একটি অনুষ্ঠান থেকে বারিকুল ও সারেঙ্গা থানায় জেলা পুলিশের 'উত্তরণ' কর্মসূচিরও সূচনা করেন মন্ত্রী।
এ বিষয়ে বাঁকুড়া জেলা পুলিশ সুপার শ্রী ভি. জি. সতীশ পাসুমার্তি (আইপিএস) জানান, এই কর্মসূচিতে বাগডুবি গ্রামের পাশাপাশি বারিকুল থানা এলাকার যুবক-যুবতীদের পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে নিয়োগের শারীরিক এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সেবা সংকল্প অভিযানের অঙ্গ হিসাবে প্রান্তিক এলাকার একটি গ্রাম দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বাগডুবি অত্যন্ত প্রত্যন্ত ও অনুন্নত এলাকা। তাই এই গ্রামকে বেছে নেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী দিনে কী কী উন্নয়ন করা যায়, তা ঠিক করা হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে প্রত্যেক বাসিন্দা পান সেই দিকেও নজরে রাখা হবে।
এ বিষয়ে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু বলেন, আমার গ্রাম বলেই এই গ্রামকে বেছে নেওয়া হয়েছে তা নয়। জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাগডুবি অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া ও প্রত্যন্ত গ্রাম। এখনও গরমের সময়ে গ্রামের কিছু মানুষ জলাশয়ের পাশে চুয়া কেটে জল পান করেন। প্রশাসনের আধিকারিকেরা নিজেরা এসে গ্রামের পরিস্থিতি দেখেছেন। আগামী দিনে বাগডুবিকে একটি মডেল গ্রাম হিসাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।
বহু ক্ষেত্রেই শোনা যায় ছোট শিশুদের দত্তক নিতে। কিন্তু এবার দত্তক নেয়া হল গোটা একটি গ্রামকে। পুলিশ ও প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার মানুষজন।
