মাছ-মাংসের দাম আগেই নাগালের বাইরে। সেই পরিস্থিতিতে ভরসা ছিল সবজি। কিন্তু এখন সেই ভরসার জায়গাতেও ধাক্কা। বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে কার্যত আগুন লেগেছে সবজির বাজারে। কলকাতা-সহ রাজ্যের একাধিক বাজারে কেজি প্রতি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। বিনসের দাম পৌঁছে গিয়েছে ২০০ টাকায়। ক্যাপসিকামও ১২০ টাকার আশপাশে। উচ্ছে, ঝিঙে, বরবটি, লাউ, ঢেঁড়স, পটল— প্রায় সব ধরনের সবজির দামই গত কয়েক সপ্তাহে এক ধাক্কায় বেড়েছে। ফলে নিত্যদিনের রান্নার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত— সকলেই।
কলকাতার গড়িয়াহাট, মানিকতলা, হাতিবাগান, নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে হাওড়া, বারাসত, দুর্গাপুর, বহরমপুর, মালদহ— রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই একই ছবি। বাজারে ঢুকেই ক্রেতাদের প্রথম প্রশ্ন, 'সবজির দাম এত বাড়ল কেন?' অনেকেই আগের মতো এক কেজি নয়, আধ কেজি বা ২৫০ গ্রাম করে সবজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবারের অভিযোগ, প্রতিদিনের রান্নার মেনু বদলাতে হচ্ছে শুধুমাত্র মূল্যবৃদ্ধির কারণে।
বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, বেগুনের পাশাপাশি বিনসের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। ক্যাপসিকাম ১০০-১২০ টাকা। উচ্ছে ও ঝিঙে ৭০-৮০ টাকা। পটল, ঢেঁড়স ও করলা ৫০-৭০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এমনকি সাধারণত সস্তা বলে পরিচিত অনেক সবজিও এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে বহু জায়গায় সবজিক্ষেত জলমগ্ন হয়েছে। ফলে উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে, অতিবৃষ্টির কারণে মাঠ থেকে পাইকারি বাজারে সবজি পৌঁছনোও ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহণ খরচও বেড়েছে। এই সব কারণ মিলিয়েই খুচরো বাজারে দামের চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে ক্রেতাদের একাংশ এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁদের অভিযোগ, পাইকারি বাজারে যে হারে দাম বাড়ছে, খুচরো বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে। মাঝের স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, বাজারে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপরও প্রভাব ফেলছে। সবজির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেটে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলির পক্ষে এই অতিরিক্ত খরচ বহন করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
ভোক্তা সংগঠনগুলির দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে রাজ্য সরকারের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত। পাইকারি ও খুচরো বাজারে দামের উপর নজরদারি বাড়ানো, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো, প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে সুলভ মূল্যে সবজি বিক্রির ব্যবস্থা করা এবং কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সবজি সংগ্রহের ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি উঠেছে।
দুর্গাপুজোর আর খুব বেশি দেরি নেই। তার আগে যদি সরবরাহ স্বাভাবিক না হয় এবং বাজারে কার্যকর নজরদারি না বাড়ে, তা হলে সবজির দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। আর সেই আশঙ্কাই এখন চিন্তা বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের। কারণ, সংসারের বাজেটে কাটছাঁট করার মতো জায়গা প্রায় শেষ। এখন প্রশ্ন একটাই— সবজির বাজারে আগুন কবে নিভবে?