তামিলনাড়ু: স্ট্যালিনের পরিচিত হাতের ভঙ্গি বিধানসভায় নকল করে আলোচনায় এসেছিলেন বিজয়। এ বার সেই ভঙ্গির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) পতাকাকে অভিবাদন জানানোর ভঙ্গির তুলনা টেনে বিজয়কে নিশানা করল ডিএমকের তথ্যপ্রযুক্তি শাখা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করতে গিয়ে একটি হাতের ইশারা কী ভাবে আদর্শগত সংঘাতের প্রতীকে পরিণত হতে পারে, তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তারই নজির।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের মার্চে। তখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন। চেন্নাইয়ে দলের সদর দফতর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় সাংবাদিকেরা তাঁকে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে হাতের তালু দিয়ে কাটার মতো একটি ভঙ্গি করেন স্ট্যালিন। তাঁর ইঙ্গিত ছিল, আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিয়ো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে।
স্ট্যালিনের ইশারা, বিজয়ের বিধানসভায় পুনরাবৃত্তি
মার্চের সেই দৃশ্যের কয়েক মাস পর, জুনে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে পরিস্থিতি বদলে যায়। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে তখন অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয়। বিধানসভায় ডিএমকের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সেই একই হাতের ভঙ্গি নকল করেন। সে সময় বিরোধী ডিএমকে বিধায়করা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। ফাঁকা বিরোধী আসনের দিকে ইঙ্গিত করে স্পিকার জে সি ডি প্রভাকরের অনুমতি নিয়ে স্ট্যালিনের সেই পরিচিত ভঙ্গি করে দেখান বিজয়।
শাসকদলের বেঞ্চ থেকে ওঠে উচ্ছ্বাস। মুহূর্তের মধ্যে সেই দৃশ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়ের অনুরাগীদের কাছে তা হয়ে ওঠে নতুন আলোচনার বিষয়। তাঁর দল তামিলগা ভেত্রি কাজগম (টিভিকে)-র সমর্থকদের একাংশও ভঙ্গিটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জবাব দেওয়ার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক বিদ্রুপের এই লড়াইয়ে অবশ্য বিদ্রূপের লক্ষ্য বদলে গিয়েছে। স্ট্যালিন যখন প্রথম ওই ভঙ্গি করেছিলেন, তখন তৎকালীন বিরোধী দল এআইএডিএমকে তাঁকে অহংকারী বলে কটাক্ষ করেছিল। পরে বিজয় একই ভঙ্গি করায় ডিএমকে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। এ বার সেই আক্রমণের ভাষা আরও তীক্ষ্ণ।
হাতের ইশারার সঙ্গে আরএসএসের তুলনা ডিএমকের
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ডিএমকের তথ্যপ্রযুক্তি শাখা সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টার প্রকাশ করে। সেখানে দু’টি অবয়বের তুলনা করা হয়েছে। এক দিকে আরএসএসের কোনও কর্মীর পতাকাকে অভিবাদন জানানোর ভঙ্গির মতো একটি ছবি, অন্য দিকে বিজয়ের পরিচিত হাতের ইশারা।
পোস্টটির বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—বিজয়কে আরএসএসের ‘পালিত সন্তান’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিএমক ফের সেই পুরনো রাজনৈতিক অভিযোগ সামনে এনেছে, বিজয়ের দল টিভিকে আসলে বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থের সহায়ক।
আরএসএসের ‘ধ্বজ প্রণাম’ বা পতাকাকে অভিবাদন জানানোর একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গি রয়েছে। সাধারণত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাত বুকের মাঝামাঝি অংশে রাখা হয়, হাতের তালু থাকে নীচের দিকে এবং মাথা সামান্য ঝোঁকানো হয়।
আরএসএসের শাখার শুরু ও শেষে এই অভিবাদন জানানো হয়। ডিএমকের পোস্টারে বিজয়ের হাতের ভঙ্গির সঙ্গে এই অভিবাদনের তুলনা টেনেই তাঁকে আরএসএসের ঘনিষ্ঠ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তবে হাতের ভঙ্গির এই তুলনা রাজনৈতিক কটাক্ষের অংশ। শুধু কোনও ভঙ্গির সাদৃশ্য থেকেই কোনও ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে আরএসএসের সাংগঠনিক সম্পর্ক প্রমাণিত হয় না। বিজয় বা টিভিকে-র সঙ্গে আরএসএসের সম্পর্ক নিয়ে ডিএমকের এই বক্তব্যকে তাই রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
বিজয়ের ভঙ্গি এখন সমর্থকদেরও ‘সিগনেচার’
বিজয়ের সেই হাতের ইশারা এখন আর বিধানসভার একটি মুহূর্তে সীমাবদ্ধ নেই। টিভিকে-র রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সমর্থকদের মধ্যে তা ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠছে। এমনকি দলের বাইরেও সেই ভঙ্গির অনুকরণ দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি তামিলনাড়ুর মন্ত্রী অরুণ রাজ একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেন। সেখানে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের কয়েক জন পড়ুয়াকে বিজয়ের পরিচিত হাতের ভঙ্গি নকল করতে দেখা যায়।
ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশও হয়ে উঠেছে। বিজয়ের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার একটি বড় ভিত্তি তাঁর দীর্ঘ দিনের চলচ্চিত্র-পরিচিতি এবং অনুরাগীদের বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী। তাঁর বক্তব্য, শরীরী ভাষা কিংবা ছোট কোনও মুহূর্তও তাই দ্রুত আলোচনায় চলে আসে। ডিএমকের সাম্প্রতিক আক্রমণ সেই জনপ্রিয়তাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারই আর একটি দিক তুলে ধরেছে।
বিজয়কে ঘিরে ‘বিজেপির বি-টিম’ বিতর্ক
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বিজয়ের দল টিভিকে-কে নিয়ে ডিএমকে-সহ বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, দলটি বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থকে সুবিধা করে দিতে পারে। বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর দলের আদর্শ এবং বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান নিয়ে এই বিতর্ক আগেও সামনে এসেছে। তবে টিভিকে-কে বিজেপির ‘বি-টিম’ বলার অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য; একে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতিতে একটি হাতের ইশারাকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। ডিএমকের বক্তব্য, বিজয়ের আচরণে আরএসএসের সঙ্গে আদর্শগত সাদৃশ্য রয়েছে। অন্য দিকে, বিজয়ের সমর্থকেরা ওই ভঙ্গিকে মূলত রাজনৈতিক নাটকীয়তা এবং স্ট্যালিনকে বিদ্রুপ করার ঘটনা হিসেবেই দেখছেন।
ঘটনার তাৎপর্য শুধু এই নয় যে, এক নেতা অন্য নেতার হাতের ভঙ্গি নকল করেছেন। বরং তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে প্রতীক, শরীরী ভাষা এবং সমাজমাধ্যমের প্রভাব কতটা বেড়েছে, এই বিতর্ক তা দেখিয়ে দিচ্ছে। এক সময় যে ভঙ্গি আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার ইঙ্গিত ছিল, সেটিই পরে বিধানসভায় বিদ্রুপের হাতিয়ার হয়েছে। এখন সেই একই ভঙ্গি দিয়ে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক আদর্শকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাইছে ডিএমকে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তাই হাতের ইশারা আর নিছক শরীরী ভাষা নয়—তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিচয়, জনপ্রিয়তা এবং আদর্শগত লড়াইয়ের নতুন অস্ত্র। স্ট্যালিনের হাতের ভঙ্গি বিজয়কে আলোচনায় এনেছিল, আর সেই ভঙ্গিকেই এ বার আরএসএসের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পাল্টা আক্রমণ শানাল ডিএমকে।
