ভর্তি হচ্ছে। ফি-ও জমা পড়ছে। কিন্তু ক্লাসে দেখা নেই পড়ুয়ার! অথচ হাজিরার খাতায় দিব্যি ৮০-৯০ শতাংশ উপস্থিতি। রাজ্যের উচ্চশিক্ষার এমন ‘অদ্ভুত’ ছবি নিয়েই প্রশ্ন তুললেন রাজ্যপাল আর এন রবি। নিউটাউন কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ নিয়ে দু’দিনের চিন্তন বৈঠকে রাজ্যের সরকারি, বেসরকারি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রধানদের সামনে কার্যত খুলে গেল উচ্চশিক্ষার অন্দরের একের পর এক ক্ষত।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারই প্রথম সমস্যাটি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্য, ভর্তি হতে বা ফি দিতে পড়ুয়াদের আপত্তি নেই। কিন্তু নিয়মিত ক্লাসে আসার প্রবণতা কমছে। কোভিডের পর সেই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। অনলাইনে এনপিটিইএল, ভিডিয়ো লেকচার-সহ নানা বিকল্প থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সরাসরি পঠনপাঠনের গুরুত্ব কমে যায় না বলেই মত তাঁর।
সেই বক্তব্য শুনেই প্রশ্ন রাজ্যপালের “কোনও পড়ুয়া ভর্তি হয়েছে, ফি দিয়েছে, তা হলে তো তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। নির্দিষ্ট শতাংশ উপস্থিতি প্রয়োজন হলে ক্লাসে না এসেও সে ৮০ বা ৯০ শতাংশ উপস্থিতি পাচ্ছে কী ভাবে?” তার পরেই রাজ্যপালের মন্তব্য, “এটা খুবই অদ্ভুত।”
কোনও নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী না করে রাজ্যপাল বলেন, এটি বৃহত্তর সমস্যা কি না, তা সব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দেখতে হবে। তাঁর প্রশ্নের মূল লক্ষ্য যেন হাজিরার খাতা নয়, সেই খাতার পিছনের বাস্তবতা পড়ুয়া আদৌ ক্লাস করছে কি না, উপস্থিতির হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য, নিয়ম মানা হচ্ছে কি না।
কিন্তু পড়ুয়া নেই তো কী! বহু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার শিক্ষক-কর্মীরও আকাল। বৈঠকে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নন্দিনী সাহু জানান, রাজ্যে প্রায় ১০টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই কার্যত ‘সিঙ্গল-স্টাফড’। এমনকি তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনিই একমাত্র ব্যক্তি বলে জানান তিনি। চারটি ডিসিপ্লিন চালু হয়েছে, দ্বিতীয় সেমেস্টারে ১৭৮ জন পড়ুয়া রয়েছে, নতুন সেমেস্টারে ভর্তি চলছে এই ইতিবাচক ছবির পাশাপাশি তিনি জানান, শিক্ষক-কর্মী ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাবে প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বা অ্যাকাডেমিক কমিটি গড়ার আবেদন জানান তিনি।
সেখানেই আরও ভয়াবহ ছবির কথা জানান রাজ্যপাল। তাঁর বক্তব্য, এমন বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে যেগুলি চলছে হস্টেল ভবনে। কোথাও পরিত্যক্ত স্কুল বা হস্টেল ভবনকে কাজে লাগানো হচ্ছে। কোথাও আবার প্রয়োজনীয় লোকবলই নেই। একজনকেই সামলাতে হচ্ছে একাধিক দায়িত্ব। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ভবন আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই। পড়ুয়া আছে কিন্তু ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি নেই। আর উপস্থিতির খাতায় আবার ৮০-৯০ শতাংশ! নিউটাউনের বৈঠকে উঠে আসা ছবিতে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার ভিত নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সম্পদের অসম বণ্টন নিয়েও সরব রাজ্যপাল। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক, কোথাও শিক্ষকই নেই। কোথাও আধুনিক পরিকাঠামো রয়েছে, কোথাও ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও অনুপস্থিত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিজেদের গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকায় এক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সম্পদ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগছে না।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে শিক্ষক, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রাজ্যপাল। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানেরই কিছু না কিছু দেওয়ার আছে। নিজেদের গণ্ডি ভেঙে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
গবেষণার ছবিও খুব একটা স্বস্তির নয়। রাজ্যে ১৬ হাজারের বেশি পড়ুয়া পিএইচডি করছেন সংখ্যাটি শুনতে ভাল লাগলেও তাঁদের মধ্যে কত জন NET বা JRF যোগ্যতাসম্পন্ন, কত জন প্রকৃত গবেষণার উপযুক্ত, সেই প্রশ্ন তুলেছেন রাজ্যপাল। তাঁর বক্তব্য, অনেক সময় চাকরি না পেয়ে পড়ুয়ারা পিএইচডিতে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে গবেষণা যেন বেকারত্ব থেকে সাময়িক আশ্রয়ের জায়গা না হয়ে ওঠে, সে দিকেও নজর প্রয়োজন।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষার অতীত ঐতিহ্যের কথাও মনে করিয়ে দেন রাজ্যপাল। এক সময় ‘বাংলা আজ যা ভাবে, দেশ ভাবে আগামীকাল’ এই কথাই প্রচলিত ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই জায়গা অনেকটাই বদলে গিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুধু ভাল পরিসংখ্যান দেখিয়ে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত ছবি বোঝা সম্ভব নয় বলেও সতর্ক করেন।
বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যেও ছিল কড়া বার্তা। শুধু টাকা-পয়সার অনিয়ম নয়, শিক্ষক ক্লাসে না যাওয়াও অনিয়ম। পড়ুয়া নিয়মিত ক্লাস না করাও সমস্যা। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠন ঠিকমতো না হওয়াও অনিয়মেরই অংশ বলে জানান তিনি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত যাচ্ছেন কি না, ক্লাস হচ্ছে কি না, পড়ুয়ারা উপস্থিত থাকছেন কি না নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলেন মন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদেরও নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে থাকার এবং পঠনপাঠনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বার্তা দেন তিনি।
নিউটাউনের বৈঠকে তাই জাতীয় শিক্ষানীতির আলোচনা ছাপিয়ে বার বার ফিরে এসেছে একটি প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, পড়ুয়া আছে, ভর্তি আছে, ফি আছে, কিন্তু শিক্ষা কোথায়?
কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও ভবন নেই, কোথাও গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও পড়ুয়ার ক্লাসে অনুপস্থিতি। তার উপর হাজিরার খাতায় ৮০-৯০ শতাংশ! রাজ্যপালের একটি প্রশ্নই যেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষার সেই বেহাল ছবিটাকে এক ঝলকে সামনে এনে দিয়েছে, “ক্লাসে না এসেও ৮০-৯০ শতাংশ উপস্থিতি কী ভাবে?”