কলকাতা: স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি বেআইনিভাবে প্রাইভেট টিউশন করানোর অভিযোগ তুলে ফের সরব হল ‘পশ্চিমবঙ্গ গৃহ শিক্ষক কল্যাণ সমিতি’। বুধবার কলকাতার নিবেদিতা ভবন অভিযানের ডাক দিয়ে বিক্ষোভ দেখান সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ এবং শিক্ষা দফতরের নিয়ম থাকা সত্ত্বেও একাংশ সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষক নিয়মিত প্রাইভেট টিউশন করছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় ৪ হাজার স্কুল শিক্ষকের নাম ও পদ-সহ একটি তালিকাও শিক্ষা দফতরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, স্কুল শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধে আদালতের নির্দেশ এবং শিক্ষা দফতরের নির্দেশিকা রাজ্যজুড়ে কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, স্কুলের শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশন করানোর ফলে পেশাদার গৃহশিক্ষকদের উপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের একটি নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে টিউশন নিতে বাধ্য করার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
বিক্ষোভকারীরা শুধু তদন্তের দাবি জানাননি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবিও জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বেআইনিভাবে প্রাইভেট টিউশনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের যেসব শিক্ষক এই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ, তাঁদের সরকারি আর্থিক সুবিধা ও ভাতা বন্ধ করার দাবিও উঠেছে।
নিবেদিতা ভবনের কাছে আয়োজিত কর্মসূচিতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে বহু গৃহশিক্ষক ও শিক্ষিকা অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা নিয়ে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাই এবার সরাসরি শিক্ষা দফতরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তালিকা জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারী গৃহশিক্ষক হীরালাল মণ্ডল বলেন, “সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা একেবারে ব্যবসার আকারে প্রাইভেট টিউশন করাচ্ছেন। অথচ আদালতের নির্দেশ রয়েছে, তাঁরা প্রাইভেট টিউশন করতে পারবেন না। ডিআই কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। তাই যেখান থেকে নিয়োগ হয়, নিবেদিতা ভবনে আমরা এসেছি। যাতে তদন্ত করা হয়, চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করুক প্রশাসন।”
আরেক গৃহশিক্ষকের অভিযোগ, “মোটা মোটা বেতন পান স্কুল থেকে, তবুও তাঁরা টিউশন পড়াচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীদের যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, তাঁদের কাছেই পড়তে। এইভাবে আমাদের সকলের ইনকাম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।”
এদিনের কর্মসূচিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে সংগঠনটি। CAG রিপোর্টের উল্লেখ করে আন্দোলনকারীদের দাবি, রাজ্যে বর্তমানে ৪,১৩৩টি স্কুল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে রয়েছে এবং ১৯,৫০২ জন শিক্ষককে পঠন-পাঠন ছাড়াই বেতন দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের দাবি, শিক্ষক সংকটে থাকা স্কুলগুলিতে ওই শিক্ষকদের দ্রুত স্থানান্তর করা হোক। তবে CAG রিপোর্টের এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি শিক্ষা দফতরের তরফে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।
গৃহশিক্ষকদের আরও দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে স্কুল শিক্ষকদের বেআইনি প্রাইভেট টিউশন নিয়ে অভিযোগগুলি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাঁদের দাবিগুলি নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বড় আকার নেবে। এখন শিক্ষা দফতর জমা পড়া ৪ হাজার নামের তালিকা খতিয়ে দেখে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকছে। একইসঙ্গে তালিকায় থাকা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
