মাথার উপর মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া ঝুললেও মাতৃভূমিবিমুখ হয়ে থাকার সময়কালটা আর দীর্ঘায়িত করতে চান না বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি আক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চান। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে— তিনি বাংলাদেশে ফিরলেই কি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ফাঁসি হবে? এর উত্তর সংক্ষেপে ‘না’। কারণ বাংলাদেশের আইন, বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা— এই তিনটি বিষয়ই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তা হলে বাংলাদেশে ফিরলে কী হতে পারে শেখ হাসিনার সঙ্গে? চলুন সম্ভাবনার অঙ্কগুলো একটু মিলিয়ে নেওয়া যাক।
কেন মৃত্যুদণ্ডের মুখে শেখ হাসিনা?
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। আদালতের রায়ে বলা হয়, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের জন্য তিনি দায়ী। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আরও একাধিক হত্যা, গণহত্যা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
দেশে ফিরলেই কি হাসিনার ফাঁসি?
না। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক। এর জন্য প্রথমেই শেখ হাসিনাকে প্রথমে গ্রেফতার বা আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। যেহেতু তাঁকে অনুপস্থিত অবস্থায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তাই তিনি নতুন করে বিচার বা রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ চাইতে পারেন। এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকতে পারে, যদি আইনগতভাবে তা গ্রহণযোগ্য হয়। সব বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রশ্ন উঠবে। সব শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সাংবিধানিক সুযোগও থাকতে পারে হাসিনার হাতে। অর্থাৎ বাংলাদেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া আইনসম্মত হবে না।
যদি ভারত হাসিনাকে ফেরত না পাঠায়?
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চাইলেও ভারত এখনও তাঁকে ফেরত দেয়নি। প্রত্যর্পণ সম্পূর্ণভাবে দুই দেশের কূটনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। ফলে তিনি দেশে ফিরবেন কি না, কিংবা কবে ফিরবেন— সেটিও ততক্ষণ অবধি এক বড়সড় প্রশ্ন হয়েই রয়ে যাবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ভারত এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিচ্ছে।
দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনা কী বলেছেন?
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফিরে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে— তা জেনেও তিনি ফিরতে চান। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তিনি আদালতেই নিজের অবস্থান তুলে ধরতে চান।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে কী কী হতে পারে?
(১) দেশে ফিরে তিনি গ্রেফতার হবেন এবং বিচারিক হেফাজতে থাকবেন।
(২) তাঁর আইনজীবীরা পুনর্বিচার, আপিল বা রায় স্থগিতের আবেদন করবেন।
(৩) আদালত আগের রায় বহাল রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
(৪) রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে মামলার গতিপথ বা সরকারি অবস্থান বদলাতেও পারে।
(৫) ভারত তাঁকে প্রত্যর্পণ না করলে তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকেই আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন।
শেখ হাসিনার বিষয়ে কী বলছে আন্তর্জাতিক মহল?
শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মতভেদ রয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, এটি জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠন বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। তবে ফিরলেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ফাঁসি হবে— এমন ধারণা সঠিক নয়।