দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে তাঁর দশ হাত, হাতে বিভিন্ন অস্ত্র, অসুরবধের দৃশ্য আর পায়ের কাছে থাকা সিংহ। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, দেবীর বাহন হিসেবে সিংহকেই কেন বেছে নেওয়া হয়েছে? হাতি, ঘোড়া কিংবা অন্য কোনও প্রাণী নয় কেন? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে পুরাণের কাহিনি, দেবীশক্তির ধারণা এবং সিংহের প্রতীকী তাৎপর্যের মধ্যে।
পুরাণের কাহিনি: দেবীর বাহন হিসেবে সিংহ এল কোথা থেকে?
হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতীতে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ও মহিষাসুরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা যখন তাঁকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন, তখন তাঁদের সম্মিলিত দৈবশক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবী। বিভিন্ন দেবতা তাঁকে নানা অস্ত্র প্রদান করেন, যা তাঁর অসীম শক্তি ও যুদ্ধক্ষমতার প্রতীক।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবী-উৎপত্তির বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, হিমালয় দেবীকে সিংহ বাহন হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন। সেই সিংহে আরোহণ করেই দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই কারণেই দেবীর একটি পরিচিত নাম ‘সিংহবাহিনী’নাঅর্থাৎ যিনি সিংহকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন।
সিংহই কেন? এর মধ্যে কী প্রতীকী অর্থ রয়েছে?
সিংহকে সাধারণত সাহস, শক্তি, কর্তৃত্ব ও নির্ভীকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বন্য প্রাণীদের মধ্যে সিংহের যে রাজকীয় উপস্থিতি, তা দেবী দুর্গার অপরাজেয় শক্তির সঙ্গে মানানসই। দেবী যখন সিংহের পিঠে বসে অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তখন সেই দৃশ্য শুধু যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায় ও শুভশক্তির সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দেবীর বাহনকে ঘিরে একটি প্রচলিত প্রতীকী ব্যাখ্যা হল, সিংহ মানুষের অন্তরের সাহস, প্রবল আবেগ এবং শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। দেবী সেই শক্তির উপর অধিষ্ঠিত অর্থাৎ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক পথে পরিচালিত করার ধারণাটিও এই চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে এটি মূলত ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যাখ্যা; একে সব শাস্ত্রে একইভাবে বর্ণিত কোনও একক মত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
মহিষাসুরবধের সঙ্গে সিংহের সম্পর্ক কী?
দেবী দুর্গার সিংহবাহিনী রূপের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য হল মহিষাসুরবধ। পুরাণের কাহিনিতে মহিষাসুর এমন এক অসুর, যে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে দেবতাদের পরাজিত করেছিল। দেবী দুর্গা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বধ করেন। এই কাহিনি ভারতীয় ধর্মীয় শিল্প, মন্দিরের ভাস্কর্য এবং দুর্গাপুজোর প্রতিমায় বারবার ফুটে উঠেছে।
এখানে সিংহও শুধু বাহন হিসেবে নিষ্ক্রিয় অবস্থানে নেই। দেবীমাহাত্ম্যর যুদ্ধবর্ণনায় দেবীর সিংহ অসুরসেনার বিরুদ্ধে লড়াইয়েও অংশ নেয়। ফলে দেবী, তাঁর অস্ত্র এবং সিংহ সব মিলিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের এক শক্তিশালী দৃশ্য তৈরি হয়।
দেবীর বাহন কি সর্বত্র সিংহই?
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার প্রতিমা ও চিত্ররূপে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও তাঁকে সিংহের সঙ্গে, আবার কোনও কোনও আঞ্চলিক উপাসনা-পরম্পরায় বাঘের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। ধর্মীয় শিল্পের ইতিহাসেও দেবীর বাহনের উপস্থাপনা সময় ও অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়েছে। গবেষকেরা প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় দেবীর সিংহবাহিনী রূপের বিকাশ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সব মিলিয়ে, দেবী দুর্গার বাহন সিংহ হওয়ার পিছনে রয়েছে পুরাণের কাহিনি এবং গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। সিংহ তাঁর শক্তি, সাহস ও অপরাজেয়তার পরিচয় বহন করে, আর মহিষাসুরবধের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা। তাই দুর্গাপুজোর প্রতিমায় দেবীর পায়ের কাছে থাকা সিংহ কেবল একটি প্রাণী নয় দেবীশক্তির মহিমা ও অশুভের বিরুদ্ধে জয়ের কাহিনিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
