চাকরির ইন্টারভিউয়ে বসের সামনে বসে কে না চান নিজেকে ‘পারফেক্ট’ প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে! কাজের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অধিকাংশেরই উত্তর—‘‘যখনই বলবেন, কাজ করব।’’ কিন্তু এক তরুণ সটান জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘‘শনিবার আমি অফিস করব না।’’ কারণ? সপ্তাহের একটা দিন তিনি নিজের জন্য রাখতে চান। ক্রিকেট খেলবেন, গিটার বাজাবেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন। এমন উত্তরে যে কোনও নিয়োগকর্তা হয়তো দরজা দেখিয়ে দিতেন। কিন্তু দিল্লির উদ্যোগপতি অভিষেক আগরওয়াল তা করেননি। বরং ওই তরুণকেই চাকরি দিয়েছিলেন। আর কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্তের ‘ফল’ পেলেন হাতে-নাতে—পর পর দু’টি কোয়ার্টারে দলের অন্য কর্মীদের পিছনে ফেলে সেরা পারফর্মার হয়ে উঠলেন ওই তরুণ।
ঘটনাটি সমাজমাধ্যমে তুলে ধরেছেন অভিষেক নিজেই। তাঁর কথায়, সাক্ষাৎকারের সময় প্রার্থীকে শনিবার কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে কোনও রাখঢাক না করে তরুণটি বলেছিলেন, ‘‘অফিসের বাইরেও আমার একটা জীবন আছে।’’ অভিষেক তখন তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, এত অল্প বয়সে শনিবার কাজ না করার এই জেদ কি আসলে অলসতার লক্ষণ নয়?
উত্তরেও পিছিয়ে যাননি তরুণ। তিনি জানান, সপ্তাহের পাঁচ দিন কাজ করার পর শনিবার ক্রিকেট খেলেন। ১৪ বছর বয়স থেকে গিটার বাজান। পরিবারকেও সময় দেন। তাঁর কাছে চাকরি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু জীবনের একমাত্র অংশ নয়।
সাক্ষাৎকার বোর্ডের সামনে সেখানেই শেষ হয়নি তর্ক। অভিষেক তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, অফিসের পরে সন্ধ্যায় ক্রিকেট বা গিটার করা যায়। রবিবারও তো ছুটি রয়েছে। কিন্তু তরুণের যুক্তি ছিল, বিষয়টি শুধু সময় বের করার নয়—কাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের একটা সুস্থ ভারসাম্য থাকা দরকার।
এর পর তিনি নিজের দাদার উদাহরণ দেন। দাদা আমেরিকায় চাকরি করেন। নিজেও দু’বার আমেরিকায় গিয়েছেন। তাঁর দাবি, সেখানে সাধারণ ভাবে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহই প্রচলিত। তবু বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি হিসাবে আমেরিকা এগিয়ে। তা হলে বেশি সময় অফিসে কাটানোই যদি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হয়, তা হলে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহেও এত সাফল্য সম্ভব কী ভাবে?
এই যুক্তিই সম্ভবত অভিষেককে ভাবিয়েছিল। কারণ, বহু প্রার্থীকে ইন্টারভিউ নেওয়ার অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, চাকরি পাওয়ার তাগিদে অনেকে নিয়োগকর্তা যা শুনতে চান, সেটাই বলেন। ‘‘যে কোনও সময় কাজ করব’’, ‘‘প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময় দেব’’—এমন প্রতিশ্রুতির অভাব থাকে না। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সময় কাজ করতে করতে অনেক কর্মীই ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কাজের প্রতি আগ্রহ হারান।
তাই শনিবার কাজের বিষয়ে আপসহীন ওই তরুণকেই শেষ পর্যন্ত নিয়োগ করেন তিনি। দায়িত্ব ছিল সেলসের। আর সেখানেই এল আসল চমক। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পর দু’টি কোয়ার্টারে দলের বাকিদের ছাপিয়ে গেলেন তিনি। অর্থাৎ, শনিবার ছুটি নেওয়া তাঁর কর্মদক্ষতার পথে বাধা হয়নি। বরং নির্দিষ্ট কাজের সময়ের মধ্যেই নিজের সেরাটা দিয়েছেন।
শুধু সংখ্যার হিসাবেও নয়, তাঁর কাজের ধরনও নজর কেড়েছে নিয়োগকর্তার। ক্লায়েন্টের কাছে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে শুধু ভাল দিকগুলি তুলে ধরেননি তিনি। পণ্যের সীমাবদ্ধতার কথাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন। গ্রাহককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। অভিষেকের মতে, সেই স্বচ্ছতাই তৈরি করেছে বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত এনে দিয়েছে সাফল্য।
ইন্টারভিউয়ের টেবিলে যে তরুণের ‘না’ শুনে প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়ে, কয়েক মাস পর সেই ‘না’-ই যেন নতুন প্রশ্ন তুলে দিল—ভাল কর্মী হওয়ার জন্য কি সব সময় বেশি ঘণ্টা কাজ করতেই হবে?
দিল্লির ওই উদ্যোগপতির অভিজ্ঞতা অন্তত বলছে, উত্তরটা সম্ভবত ‘না’। কর্মীর দক্ষতা মাপার আসল জায়গা অফিসে কাটানো ঘণ্টা নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি কী ফল দিতে পারছেন। শনিবার ক্রিকেট, গিটার আর পরিবারকে সময় দিয়েও যদি কেউ পর পর দু’টি কোয়ার্টারে দলের সেরা হন, তবে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স’কে অলসতার অন্য নাম বলা হয়তো আর এত সহজ নয়।