দিব্যেন্দু ঘোষ
শহুরে রোজনামচার ক্লান্তিকর হিসেবনিকেশের বাইরে গিয়ে জীবনের আদিম স্পন্দনের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ আমাদের মতো আটপৌরে বাঙালির সচরাচর ঘটে না। তবে ১০ জুলাই, ২০২৬-এর বৃষ্টিভেজা সন্ধেটা ছিল এক ঘোরলাগা ব্যতিক্রম। কলকাতার রোটারি সদনের গমগমে প্রেক্ষাগৃহে সেদিন তৈরি হয়েছিল রোমাঞ্চকর আবহ। উপলক্ষ ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ এবং জয়দীপ কুণ্ডুর সংস্থা ‘শের’ (SHER - সোসাইটি ফর হেরিটেজ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিসার্চ)-এর বাৎসরিক মিলনোৎসব।
অনুষ্ঠানকক্ষে ঢুকেই অদ্ভুত এক শিহরণ অনুভব করলাম। আমার ঠিক পাশের আসনেই রুপোলি পর্দার দুই মহীরুহ— সব্যসাচী চক্রবর্তী এবং শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। বন্যপ্রাণ ও গভীর জঙ্গলের প্রতি তাঁদের দুজনেরই যে অদম্য টান, তা আপামর বাঙালির অজানা নয়। যাবতীয় স্টারডম আর সেলিব্রিটি-সুলভ গাম্ভীর্য সরিয়ে রেখে দর্শকাসনে বসে পরম মুগ্ধতায় তাঁরা গোটা অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলেন। প্রকৃতির এই বিশাল ক্যানভাসের সামনে তাঁদের চোখেমুখেও স্পষ্ট খেলা করছিল এক অদ্ভুত বিস্ময় আর রোমাঞ্চ, যা এই সন্ধের আভিজাত্য ও নান্দনিকতা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বাংলা সিনেমা হোক বা ওয়েব সিরিজ, যে দুর্ধর্ষ কমেডিয়ান ও ভিলেনকে দেখে আমরা অভ্যস্ত, সেই জয়দীপ কুণ্ডুর এ এক ভিন্ন সত্তা। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সুচন্দ্রা কুণ্ডু তথাকথিত গ্ল্যামারসর্বস্ব, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সমাজসেবার আলোকবৃত্ত থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষ ও বন্যপ্রাণের সহাবস্থান নিয়ে যে অবিশ্বাস্য ও নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, সেই সব মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এদের এই অক্লান্ত, মাটি-কামড়ে পড়ে থাকা জেদ আক্ষরিক অর্থেই এক বিরাট অনুপ্রেরণা। প্রচারের আলো থেকে শত যোজন দূরে থাকা এই মানুষগুলোর বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা কুর্নিশযোগ্য।
অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধেই আমরা এক অবিশ্বাস্য ও রোমহর্ষক বাস্তবের মুখোমুখি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তোর্সা নদীর বিধ্বংসী বন্যায় জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের একটা বড় অংশ কীভাবে ভেসে যায়, তার এক জীবন্ত দলিল তুলে ধরা হয়। জলের প্রবল তোড়ে জঙ্গল থেকে ছিটকে লোকালয়ে চলে যায় ১৩টি অতিবিপন্ন একশৃঙ্গ গন্ডার। টানা ৫২ দিন ধরে দিনরাত এক করে, ১৯টি কুনকি হাতি, দমকল, পুলিশ আর দুশোর বেশি বনকর্মীর সেই রুদ্ধশ্বাস লড়াই যেন হলিউডের যে কোনও টানটান থ্রিলারকেও হার মানায়! নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে যে অখ্যাত, সাধারণ বনকর্মীরা ওই ১৩টি গন্ডারকে সুস্থ অবস্থায় জঙ্গলে ফিরিয়ে এনেছিলেন, সেই ‘রিয়েল লাইফ হিরো’দের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বারবার শিহরিত হচ্ছিলাম। তাঁদের সেই অসমসাহসী লড়াইয়ের গল্প শুনে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। শিরোনামের আড়ালে থাকা জলদাপাড়া ও কোচবিহার ফরেস্ট ডিভিশনের সেই অখ্যাত অপারেশনে যুক্ত ১০ বনকর্মীকে তাঁদের অসামান্য অবদানের জন্য সম্মান জানায় ‘শের’।
তবে এই ঘোরলাগা সন্ধের আসল থ্রিলার অপেক্ষা করছিল অন্তিম লগ্নে। ওয়াইল্ডলাইফ এবং কনজাভেশন ফটোগ্রাফার হিসেবে ধৃতিমান মুখার্জির নামটা চেনা হলেও, মঞ্চে দাঁড়ানো ওই লাজুক, নিরহঙ্কার মানুষটার জীবন যে এতটা দুঃসাহসিক, তা নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। আমাদের গতে বাঁধা ইঁদুর দৌড় যেখানে শেষ হয়, ধৃতিমানের স্বপ্ন-উড়ান সেখান থেকেই শুরু। প্রকৃতির দুর্লভ রহস্য লেন্সবন্দি করতে তিনি এক অবাধ বিচরণশীল সত্তা। বিলুপ্তপ্রায় শকুন বা ঈগলের নিখুঁত ছবি তুলতে তিনি অবলীলায় প্যারাগ্লাইডিং করে আকাশে ওড়েন। আবার মেক্সিকোর বাঙ্কো চিনচোরো-র গভীরে হিংস্র কুমিরের সঙ্গে বিনা খাঁচায় নির্দ্বিধায় সাঁতার কাটেন! কখনও তিনি কঙ্গোর নিবিড় জঙ্গলে রূপকথার মতো মাউন্টেন গোরিলার ডেরায়, কখনও বা স্পিতির মাইনাস ৩০ ডিগ্রি হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বরফের মধ্যে দিনের পর দিন শুয়ে থাকেন একটিমাত্র স্নো লেপার্ডের ফ্রেমের অপেক্ষায়। গ্রিনল্যান্ডের হাড়হিম করা মাইনাস তাপমাত্রার জমাট বরফসমুদ্রের অতলে ডুব দিয়ে ৩০০ বছর বয়সী প্রাগৈতিহাসিক ‘গ্রিনল্যান্ড শার্ক’-কে লেন্সবন্দি করা কিংবা আমাজনের গহিন ঘোলা জলে নেমে অতিকায় অ্যানাকোন্ডার মুখোমুখি হওয়া— ধৃতিমানের কাছে এসব যেন রোজকার অভ্যেস! ফুটন্ত জীবন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা মানুষটার কাছে নিরাপদ দূরত্ব থেকে বাঘের ছবি তোলা তো নেহাতই বালখিল্য ব্যাপার! তাঁর এই বিশ্বজোড়া দুঃসাহসিক অভিযানের রোমহর্ষক বর্ণনা আমাদের সমস্ত শহুরে অহমিকাকে চূর্ণ করে দিচ্ছিল। দর্শকাসনে বসা ওঁর রত্নগর্ভা মায়ের চোখে তখন চিকচিক করছে গর্বের আনন্দাশ্রু। ধৃতিমানের একটি শান্ত অথচ ধারালো কথা হৃদয়ে চিরতরে গেঁথে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। ‘Can't make an animal villain to become a hero.’ হলিউডের সস্তা চিত্রনাট্য দেখে প্রাণীদের অকারণে ভিলেন ভাবার কোনও অর্থ নেই। অরণ্য কারও শত্রু নয়, কেবল মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক হাস্যকর আস্ফালনই সমস্ত সংঘাতের মূল। প্রকৃতির কাছে জ্ঞান আর সহমর্মিতাই হল আমাদের প্রকৃত আনন্দের চাবিকাঠি।
একরাশ মুগ্ধতা আর বন্যপ্রাণের প্রতি গভীর ভালবাসা বুকে নিয়ে ঘরে ফেরার সময় মনে হয়েছে, এই চমৎকার সন্ধে কেবল অরণ্যের নয়, জীবনের এক অন্য মাত্রার উদ্যাপন হয়ে রয়ে গেল।