বিশেষ প্রতিবেদন: একটা সময় পৃথিবীর মাটিতে তারই রাজত্ব। প্রায় ৪৩ ফুট লম্বা শরীর, ওজন প্রায় ৯ টন। এক কামড়ে শিকার ছিঁড়ে ফেলার মতো শক্তিশালী চোয়াল। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের অন্যতম সে—নাম ‘স্কটি’। কিন্তু এত বিশাল এক শিকারির শেষটা কী ভাবে হয়েছিল?
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর পরে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা। স্কটির জীবাশ্মের পাঁজরের হাড়ে পাওয়া ক্ষত এবং তার ভিতরে সংরক্ষিত রক্তনালির অসাধারণ চিহ্ন বলছে, মৃত্যুর আগে ভয়ঙ্কর কোনও সংঘর্ষে জখম হয়েছিল সে। শুধু তা-ই নয়, আঘাতের পরে তার শরীর সেই ক্ষত সারানোর চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু সেই লড়াইয়ের ক্ষত থেকে আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়নি বিশালাকার এই শিকারি।
১৯৯১ সালে কানাডার সাসকাচোয়ানে স্কটির জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়। পরে গবেষণায় তার আকার ও ওজন সম্পর্কে যে তথ্য সামনে আসে, তাতে বিস্মিত হন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ১৩ মিটার লম্বা এবং আনুমানিক ৮.৮ টন ওজনের এই টি-রেক্সকে তাই ‘সবচেয়ে বড়’ টি-রেক্সের তালিকায় বিশেষ জায়গা দেওয়া হয়।
কিন্তু স্কটির আসল রহস্য লুকিয়ে ছিল তার হাড়ে। কোটি কোটি বছর ধরে মাটির নীচে থাকার পরেও জীবাশ্মের পাঁজরের একটি অংশে দেখা যায় পুরনো আঘাতের চিহ্ন। সাধারণ ভাবে হাড় ভাঙার পরে শরীর ক্ষত সারাতে সেখানে নতুন রক্তনালির জাল তৈরি করে। স্কটির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই হয়েছিল বলে মনে করছেন গবেষকেরা। পার্থক্য একটাই—এই রক্তনালির কাঠামো জীবাশ্মে খনিজীকৃত অবস্থায় থেকে গিয়েছে।
এই সূক্ষ্ম গঠন দেখতে সাধারণ এক্স-রে যথেষ্ট ছিল না। গবেষকেরা ব্যবহার করেন অত্যাধুনিক নিউট্রন ইমেজিং প্রযুক্তি। ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পাঁজরের হাড়ের ভিতরের অংশকে ত্রিমাত্রিক ভাবে পরীক্ষা করা হয়। ফলে হাড় না কেটেই তার অভ্যন্তরের ক্ষত এবং টিস্যুর কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
গবেষকদের নজরে আসে পাঁজরের নির্দিষ্ট অংশে অস্বাভাবিক গঠন। ক্ষতস্থানের চারপাশে থাকা ক্ষুদ্র রক্তনালির জাল কার্যত একটি প্রাগৈতিহাসিক ‘মেডিক্যাল রিপোর্ট’-এর মতো। তার থেকেই অনুমান, আঘাতটি মৃত্যুর বহু আগে হয়নি; বরং মৃত্যুর কিছুটা আগে ওই চোট পেয়েছিল স্কটি এবং তার শরীর তা সারানোর চেষ্টা করছিল।
কী ভাবে হল সেই আঘাত?
গবেষকদের অন্যতম ধারণা, অন্য কোনও ডাইনোসরের সঙ্গে সংঘর্ষে জখম হয়েছিল স্কটি। টি-রেক্সদের মধ্যে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের প্রমাণ আগেও জীবাশ্মে পাওয়া গিয়েছে। শিকার নিয়ে লড়াই, এলাকা দখল অথবা অন্য কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমন আঘাত হতে পারে। তবে ঠিক কোন প্রাণীর সঙ্গে তার লড়াই হয়েছিল, তা জীবাশ্ম থেকে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
আঘাতেই কি মৃত্যু?
গবেষকদের বক্তব্য, শুধু পাঁজরের ক্ষতকে সরাসরি মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না। বরং প্রমাণ বলছে, ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ আঘাতের পরেও কিছু সময় বেঁচেছিল সে। কিন্তু সেই সময় কতটা, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত কী কারণে মৃত্যু হয়েছিল, সে বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবু এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এত পুরনো প্রাণীর দেহে ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ার এমন সূক্ষ্ম চিহ্ন বিজ্ঞানীদের সামনে ডাইনোসরদের শারীরবিদ্যা এবং জীবনযাত্রার নতুন ছবি তুলে ধরছে। কোটি কোটি বছর আগে তারা শুধু কতটা ভয়ঙ্কর ছিল, তা নয়—আঘাত পেলে তাদের শরীর কী ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাত, সেই প্রশ্নেরও উত্তর মিলছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এই গবেষণা দেখাচ্ছে—জীবাশ্ম মানেই শুধু পাথরে পরিণত হাড় নয়। তার ভিতরে কখনও কখনও লুকিয়ে থাকে রক্তনালি, আঘাত, রোগ এবং মৃত্যুর মতো জীবনের অতি সূক্ষ্ম চিহ্নও। ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল স্কটি। কিন্তু তার হাড়ের ভিতরে আটকে থাকা সেই ক্ষুদ্র রক্তনালির ছাপ যেন সময়ের কুয়াশা সরিয়ে বলে দিচ্ছে—শেষ লড়াইয়ের আগে কী ঘটেছিল সেই দৈত্যাকার শিকারির শরীরে।