ওয়াশিংটন: বাইরে থেকে দেখলে নিছক পাথর আর ধ্বংসস্তূপের স্তূপ। কোথাও বরফের চিহ্নও নেই। অথচ সেই পাথরের নীচেই লুকিয়ে রয়েছে বিপুল জলভাণ্ডার—বরফ হয়ে জমে থাকা প্রায় ১০০ কোটি টন জল! আমেরিকার উটা রাজ্যের পাহাড়ে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চমকপ্রদ তথ্য।
ঘটনাস্থল মাউন্ট টিম্পানোগোস। সল্ট লেক সিটি ও প্রোভোর কাছের এই পাহাড়ের ঢালে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের হিমবাহ, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘রক গ্লেসিয়ার’। সাধারণ হিমবাহের মতো এখানে বরফ খোলা আকাশের নীচে দেখা যায় না। বরং মোটা পাথর, নুড়ি ও ধ্বংসাবশেষের আস্তরণ বরফকে ঢেকে রেখেছে। সেই কারণেই এত দিন পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটলেও নীচে জমে থাকা বিশাল বরফের অস্তিত্ব বোঝার উপায় ছিল না।
গবেষকদের হিসাব বলছে, উটা রাজ্যে এমন ৮৩৬টি রক গ্লেসিয়ার রয়েছে। টিম্পানোগোসের একটি হিমবাহের অভ্যন্তরীণ গঠন বিশদে মাপার পর তার ভিত্তিতে গোটা উটার রক গ্লেসিয়ারগুলিতে প্রায় ১০০ কোটি টন জল বরফ হয়ে আটকে থাকার সম্ভাবনা দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু টিম্পানোগোসের ওই একটি রক গ্লেসিয়ারেই রয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ ঘনমিটার বরফ—যা প্রায় ৬০০টি অলিম্পিক মাপের সুইমিং পুল ভরার সমান।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়, ওই বরফের পরিমাণও কম নয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, টিম্পানোগোস রক গ্লেসিয়ারের আয়তনের প্রায় ৮৩ শতাংশই বরফ, বাকি ১৭ শতাংশ পাথর ও ধ্বংসাবশেষ। কোথাও কোথাও বরফের স্তর প্রায় ১২০ ফুট গভীর পর্যন্ত পৌঁছেছে। সবচেয়ে মোটা অংশে গভীরতা প্রায় ১৫০ ফুট পর্যন্ত বলে গবেষকদের তৈরি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রে উঠে এসেছে।
কিন্তু পাথরের এত নীচে বরফের সন্ধান মিলল কী ভাবে?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মাধ্যাকর্ষণে। সাধারণ রাডার বা প্রচলিত পদ্ধতিতে পাথর ও ধ্বংসাবশেষের নীচে লুকিয়ে থাকা বরফের ছবি পাওয়া কঠিন। তাই গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত সংবেদনশীল গ্র্যাভিমিটার। বরফের ঘনত্ব পাথরের তুলনায় অনেক কম। ফলে কোনও জায়গার নীচে যত বেশি বরফ থাকে, সেখানে মাধ্যাকর্ষণের টানও সামান্য কম হয়। সেই সূক্ষ্ম পার্থক্য মেপেই ভিতরে কতটা বরফ রয়েছে, তার ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
২০২৪ সালে গবেষকেরা টিম্পানোগোস রক গ্লেসিয়ারের উপর ২৩২টি জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ পরিমাপ করেন। প্রতিটি পরিমাপের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫ মিটার। পরে সেই তথ্যের সঙ্গে কম্পিউটার মডেল ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ জুড়ে তৈরি করা হয় বরফের অভ্যন্তরীণ মানচিত্র।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু চমকেই নয়, জলবায়ু ও ভবিষ্যতের জল-নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িয়ে। পাথরের মোটা আস্তরণ ভিতরের বরফকে সূর্যের তাপ থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। ফলে সাধারণ হিমবাহের তুলনায় এই ‘লুকনো’ বরফ উষ্ণ পরিবেশেও দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়লে এই বরফ কত দ্রুত গলবে, তার প্রভাব স্থানীয় জলসম্পদের উপর কী হবে—তা বোঝার জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
আরও বড় হিসাবও সামনে এনেছেন গবেষকেরা। উটার তথ্যকে বিশ্বের অন্যান্য রক গ্লেসিয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁদের অনুমান, পৃথিবীর প্রায় ৫০ হাজার রক গ্লেসিয়ারে মোট ৪৮ গিগাটন জল বরফ হয়ে আটকে থাকতে পারে। অর্থাৎ পাহাড়ের পাথুরে শরীরের নীচে এমন এক বিশাল জলভাণ্ডার ছড়িয়ে রয়েছে, যার বড় অংশ এত দিন কার্যত মানুষের চোখের আড়ালেই ছিল।
পাহাড়ের গায়ে তাই যা চোখে পড়ে, সেটাই যে তার সম্পূর্ণ গল্প নয়—উটার মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা এই বরফ যেন তারই নতুন প্রমাণ। পাথরের পাহাড়ের নীচে জমে থাকা বরফ ভবিষ্যতের জল-নিরাপত্তার কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারে, এখন সেটাই বিজ্ঞানীদের পরবর্তী প্রশ্ন।