হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বাংলাদেশে ট্রাক, ট্রলি আর পাওয়ার টিলারের যুগেও হারিয়ে যায়নি গ্রাম বাংলার চিরচেনা মহিষের গাড়ি। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মাঠে মাঠে এখন শুধু মহিষের গাড়ির হাঁকডাক। কৃষকের কাঁধে সোনালী আঁশ পাট বোঝাই করে ছুটে চলেছে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। এমন দৃশ্য চোখে পড়বে উপজেলার প্রায় প্রতিটি মাঠে।
সম্প্রতি উপজেলার সাহারবাটি, ধানখোলা, তেঁতুলবাড়ীয়া,ও রাইপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার ব্যস্ততা প্রায় শেষ।মাঠের পর মাঠ সবুজ পাট কেটে আঁটি বেঁধে রাখা হয়েছে। আর সেই আঁটি বোঝাই পাট জাগ দেওয়ার জন্য পাশের পুকুর, খাল ও নদীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মহিষের গাড়িতে করে।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে মাঠের কাঁচা রাস্তা কাদায় একাকার হয়ে যায়। সেখানে কোনো যান্ত্রিক গাড়ি ঢুকতে পারে না, ঢুকলেও আটকে যায়। কিন্তু শক্তিশালী মহিষের গাড়ি সহজেই কাদা ভেঙে ফসল বয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া খরচও অনেক কম।
সাহারবাটি গ্রামের পাট চাষি আকবর আলী বলেন, এখন এক বিঘা জমি থেকে ১০-১২ মণ পাট হয়। এই পাট মাঠ থেকে বাড়ি নিতে ট্রাক্টরে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা লাগে। কিন্তু মহিষের গাড়িতে ৮০০-১০০০ টাকাতেই হয়ে যায়। আমাদের মতো ছোট কৃষকের জন্য এটাই লাভ।
গাড়োয়ান মোনতাজ আলী জানান, আমার এক জোড়া মহিষ আছে। পাটের মৌসুমে প্রতিদিন ১-২ ট্রিপ মারতে পারি। তাতে ১৫০০-২০০০ টাকা আয় হয়। সারা বছর তো এই গাড়ির কাজ থাকে না, এই সময়টাতেই একটু আয় হয়।
এক সময় যোগাযোগের প্রধান বাহন ছিল এই মহিষ ও গরুর গাড়ি। কালের বিবর্তনে তা প্রায় হারিয়ে গেছে। তবে গাংনীর মতো কৃষি প্রধান এলাকায় এখনো ধান, পাট ও আখের মৌসুমে এর কদর বেড়ে যায়। বিশেষ করে মেহেরপুরের গাংনীর বিখ্যাত তালসারি রাস্তা দিয়ে যখন সারি সারি পাট বোঝাই মহিষের গাড়ি যায়, তখন তা এক অন্যরকম গ্রামীণ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এবছর গাংনীতে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। কৃষকরা যাতে ভালো দাম পায়, সেজন্য আমরা মাঠে কাজ করছি। আর মহিষের গাড়ি আমাদের কৃষির সাথে মিশে আছে, এটা পরিবেশ বান্ধবও বটে।
গ্রামের প্রবীণরা বলছেন, যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় সবকিছু বদলে গেলেও এই মহিষের গাড়ি গ্রাম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। এটি শুধু বাহন নয়, এটি কৃষকের আবেগ আর সংগ্রামের প্রতীক।